শরীফুল শেখ, স্টাফ রিপোর্টার
সুন্দরবনের ভেতর দিয়ে প্রবাহিত পশুর নদীতে তেলবাহী ট্যাংকারের ধাক্কায় প্রায় ১ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন কয়লাবোঝাই একটি কার্গো জাহাজ ডুবে গেছে। সোমবার রাত ৯টার দিকে পশুর চ্যানেলের সুন্দরী কোঠা এলাকায় এ দুর্ঘটনা ঘটে। জাহাজে থাকা নয়জন কর্মী সাঁতরে পাশের একটি কার্গো জাহাজে আশ্রয় নেওয়ায় প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি। তবে ডুবে যাওয়া জাহাজের কয়লা নদীতে ছড়িয়ে পড়লে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও জলজ পরিবেশের ক্ষতির আশঙ্কা করছেন পরিবেশকর্মীরা। দুর্ঘটনাস্থলে বন বিভাগের একটি দল পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে বন বিভাগ।
ডুবে যাওয়া জাহাজটির নাম এমভি ফুলবাড়ী। এটি তানিয়া শিপিং লাইন্সের মালিকানাধীন। কয়লা নিয়ে জাহাজটির নরসিংদীর ঘোড়াশালে যাওয়ার কথা ছিল। এর আগে সোমবার সকাল ৭টার দিকে মোংলা বন্দরের হিরণ পয়েন্টে অবস্থানরত বিদেশি বাণিজ্যিক জাহাজ এমভি ইয়াস জুপিটার থেকে কয়লা বোঝাই করে মোংলার উদ্দেশে রওনা হয় এমভি ফুলবাড়ী।
জাহাজটির মাস্টার সুজন মোল্লা জানান, পশুর চ্যানেলের সুন্দরী কোঠা এলাকায় পৌঁছালে একটি তেলবাহী ট্যাংকারের ধাক্কায় কার্গোটি দুর্ঘটনার কবলে পড়ে। একপর্যায়ে এটি নদীতে ডুবে যায়।
কার্গো জাহাজের চালক প্রশান্ত চন্দ্র শীল বলেন, দুর্ঘটনার সময় জাহাজে নয়জন কর্মী ছিলেন। জাহাজটি ডুবতে শুরু করলে তাঁরা দ্রুত সাঁতরে পাশের একটি কার্গো জাহাজে আশ্রয় নেন। এতে সবাই প্রাণে রক্ষা পান।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, জাহাজটিতে প্রায় ১ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন কয়লা ছিল। জাহাজটি সম্পূর্ণ ডুবে যাওয়ায় কতটা কয়লা নদীতে ছড়িয়ে পড়েছে, তা তাৎক্ষণিকভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
মঙ্গলবার বিকেলে মোংলা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান জানান, কয়লাবোঝাই কার্গো জাহাজডুবির খবর তিনি শুনেছেন। তবে এ ঘটনায় অভিযোগ বা সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করতে কার্গো প্রতিষ্ঠানের কেউ থানায় আসেননি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
কয়লা ছড়িয়ে পড়ার শঙ্কা
পূর্ব সুন্দরবনের চাঁদপাই রেঞ্জের সহকারী বন সংরক্ষক দীপন চন্দ্র দাস বলেন, জাহাজটি যেখানে ডুবেছে, সেই স্থান সুন্দরবনের চরাপুটিয়া টহল ফাঁড়ির আওতাধীন। দুর্ঘটনার খবর পেয়ে মঙ্গলবার সকালে বন বিভাগের একটি দল ঘটনাস্থলে পাঠানো হয়েছে। জাহাজ থেকে কয়লা ছড়িয়ে বনের পরিবেশের ক্ষতি হচ্ছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করে পরবর্তী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সুন্দরবন পূর্ব বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা রেজাউল করিম চৌধুরী বলেন, দুর্ঘটনার সময় নদীতে ভাটা ছিল। ডুবে যাওয়া জাহাজের কয়লা নদীর পানিতে ছড়িয়ে পড়েছে কি না, তা জোয়ারের সময় পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে বোঝা যেতে পারে। বনকর্মীদের সার্বিক পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
সুন্দরবনের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ
পশুর নদীতে কয়লাবোঝাই জাহাজডুবির ঘটনায় সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও জলজ প্রাণীর সম্ভাব্য ক্ষতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন পরিবেশকর্মীরা। তাঁদের অভিযোগ, সুন্দরবনের ভেতরে বারবার কয়লা ও তেলবাহী জাহাজ দুর্ঘটনায় পড়লেও তা প্রতিরোধে কার্যকর উদ্যোগের ঘাটতি রয়েছে।
পরিবেশবাদী সংগঠন পশুর রিভার ওয়াটারকিপার ও ‘সুন্দরবন রক্ষায় আমরা’র সমন্বয়কারী মো. নূর আলম শেখ বলেন, সুন্দরবনের ভেতরে বারবার কয়লাবোঝাই জাহাজডুবির ঘটনা ঘটছে। মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ পশুর চ্যানেলের মূল নৌপথ নিরাপদ থাকার কথা বললেও পরিবেশগত দিক থেকে সুন্দরবন ও পশুর নদীর নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
নূর আলম শেখের দাবি, সাম্প্রতিক গবেষণা প্রতিবেদনে পশুর নদীর মাছের দেহে সিসা, তামা ও পারদের মতো ভারী ধাতুর উপস্থিতি সহনীয় মাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার তথ্য উঠে এসেছে। কয়লা ও শিল্পদূষণকে এর অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি। তাঁর আশঙ্কা, জোয়ারের পানিতে ডুবে যাওয়া জাহাজের কয়লা ছড়িয়ে পড়লে সুন্দরবনের জীববৈচিত্র্য ও পশুর নদীর জলজ প্রাণী ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
তিনি বলেন, বারবার কয়লা ও তেলবাহী জাহাজডুবির ঘটনা সুন্দরবনের পরিবেশগত নিরাপত্তা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করছে। এসব দুর্ঘটনা প্রতিরোধে নৌপরিবহন মন্ত্রণালয়, মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ ও বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) আরও কার্যকর ভূমিকা নেওয়া প্রয়োজন।
নৌপথে চলাচল স্বাভাবিক, উদ্ধারের উদ্যোগ
জাহাজডুবির পর পশুর চ্যানেলে নৌযান চলাচল নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হলেও মূল নৌপথে চলাচল স্বাভাবিক রয়েছে বলে জানিয়েছে মোংলা বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর কর্তৃপক্ষের সদস্য (হারবার ও মেরিন) কমডোর মো. শফিকুল ইসলাম সরকার বলেন, পশুর চ্যানেলের মূল নৌপথ নিরাপদ রয়েছে এবং এ পথে নৌযান চলাচল স্বাভাবিক আছে। ডুবে যাওয়া জাহাজটি উদ্ধারে মালিকপক্ষ দ্রুত ব্যবস্থা নিচ্ছে বলেও জানান তিনি।