রেজাউল করিম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির জন্য বাংলাদেশকে আরও তিন বছর সময় দেওয়ার প্রস্তাব নিয়ে আজ বৃহস্পতিবার রাতে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা রয়েছে। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের উত্তরণের নির্ধারিত তারিখ ২০২৬ সালের ২৪ নভেম্বর থেকে পিছিয়ে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত নির্ধারিত হতে পারে। তবে এ বিষয়ে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত এখনো বাকি।
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অনিশ্চয়তা, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চাপ, রপ্তানি খাতের চ্যালেঞ্জ এবং দেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক দুর্বলতা বিবেচনায় নিয়ে উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। বাড়তি সময় পেলে অর্থনীতির সক্ষমতা বৃদ্ধি, রপ্তানি বাজার ধরে রাখা এবং এলডিসি-পরবর্তী পরিস্থিতি মোকাবিলার প্রস্তুতি জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ।
গত ১৮ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশ জাতিসংঘের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে তিন বছর অতিরিক্ত সময় চেয়ে আবেদন করে। বিষয়টি পর্যালোচনা করে জাতিসংঘের উন্নয়ন নীতিবিষয়ক কমিটি (সিডিপি) প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর প্রস্তাব সমর্থন করে। পরে জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) সাধারণ পরিষদকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুপারিশ করে। প্রস্তাবটি উরুগুয়ে উত্থাপন করবে বলে জানা গেছে।
তিন বছর সময় বাড়লে যেসব সুবিধা পেতে পারে বাংলাদেশ
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানো হলে আন্তর্জাতিক বাজারে বিদ্যমান অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা ব্যবহার, রপ্তানি প্রতিযোগিতা ধরে রাখা এবং অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা মোকাবিলার জন্য বাড়তি সময় পাবে বাংলাদেশ। তবে সব ধরনের সুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহাল থাকবে কি না, তা সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বাণিজ্য অংশীদারদের নিয়মের ওপর নির্ভর করবে।
১. রপ্তানিতে শুল্কমুক্ত সুবিধা ধরে রাখার সুযোগ
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ বিভিন্ন বাজারে শুল্কমুক্ত ও কোটামুক্ত প্রবেশাধিকারের সুবিধা পেয়ে আসছে। উত্তরণের সময় পিছিয়ে গেলে এসব সুবিধা ব্যবহারের জন্য বাড়তি সময় পাওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে প্রতিযোগিতা ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক ক্রেতাদের কাছে পণ্যের মূল্য প্রতিযোগিতামূলক রাখার ক্ষেত্রে এটি গুরুত্বপূর্ণ।
২. তৈরি পোশাক খাতের চাপ মোকাবিলা
বাংলাদেশের রপ্তানি আয়ের প্রধান উৎস তৈরি পোশাকশিল্প। এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন বাজারে শুল্ক আরোপের ঝুঁকি তৈরি হলে বাংলাদেশের পোশাকের দাম বাড়তে পারে এবং ক্রেতাদের আগ্রহ কমার আশঙ্কা রয়েছে। অতিরিক্ত সময় কাজে লাগিয়ে উৎপাদন ব্যয় কমানো, প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো, শ্রমিকদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির মাধ্যমে এ খাতের প্রতিযোগিতা সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
৩. ওষুধশিল্পের প্রস্তুতির সুযোগ
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) মেধাস্বত্বসংক্রান্ত চুক্তি—ট্রিপসের অধীনে নির্দিষ্ট কিছু ছাড় ও নমনীয়তা পেয়ে থাকে। এসব সুবিধা জেনেরিক ওষুধ উৎপাদন ও তুলনামূলক কম দামে ওষুধ সরবরাহে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়লে প্রযোজ্য আন্তর্জাতিক নিয়মের আওতায় এসব সুবিধা ব্যবহারের সুযোগ থাকতে পারে। এ সময়ে গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি উন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের প্রস্তুতি জোরদার করা সম্ভব হবে।
৪. রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা
বাংলাদেশের রপ্তানি আয় এখনো তৈরি পোশাকনির্ভর। চামড়াজাত পণ্য, ওষুধ, কৃষিপণ্য, হালকা প্রকৌশল ও তথ্যপ্রযুক্তিসহ সম্ভাবনাময় খাতগুলোর রপ্তানি বাড়ানো জরুরি। বাড়তি তিন বছর কার্যকরভাবে কাজে লাগানো গেলে নতুন পণ্য ও বাজার তৈরি করে একটি খাতের ওপর অতিনির্ভরতা কমানোর সুযোগ তৈরি হবে।
৫. নতুন বাণিজ্যচুক্তির উদ্যোগ
ইউরোপীয় ইউনিয়নসহ গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য অংশীদারদের সঙ্গে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ), অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) এবং অন্যান্য অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা এগিয়ে নেওয়া যাবে। এসব উদ্যোগ সফল হলে এলডিসি-পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রপ্তানিপণ্যের জন্য অনুকূল বাজারসুবিধা নিশ্চিত করার সম্ভাবনা বাড়বে।
৬. বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ
উৎপাদন ব্যয়, বন্দর ব্যবস্থাপনা, জ্বালানি সরবরাহ, পরিবহন ও সরবরাহব্যবস্থার দুর্বলতা দূর করা গেলে বিদেশি বিনিয়োগকারীদের কাছে বাংলাদেশ আরও আকর্ষণীয় হতে পারে। বাড়তি সময়ে শিল্পাঞ্চলের অবকাঠামো উন্নয়ন, ব্যবসা পরিচালনার ব্যয় কমানো এবং নীতিগত অনিশ্চয়তা দূর করার উদ্যোগ নেওয়া সম্ভব হবে।
৭. ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতে সংস্কার
এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতি শুধু রপ্তানি খাতের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। দুর্বল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, খেলাপি ঋণ, কম রাজস্ব আদায়, বিনিয়োগে স্থবিরতা এবং ব্যবসায়িক ব্যয়ের মতো সমস্যাগুলোও মোকাবিলা করতে হবে। অতিরিক্ত সময় এসব ক্ষেত্রে কার্যকর সংস্কার বাস্তবায়ন এবং অর্থনীতির ভিত্তি শক্তিশালী করার সুযোগ দিতে পারে।
৮. আন্তর্জাতিক সহায়তা ও কারিগরি সক্ষমতা বৃদ্ধি
এলডিসি হিসেবে বাংলাদেশ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উদ্যোগে বিশেষ সহায়তা ও কারিগরি সহযোগিতার সুযোগ পায়। উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানো হলে প্রযোজ্য নিয়ম অনুযায়ী এলডিসি-সংশ্লিষ্ট কিছু সহায়তা ব্যবহারের সুযোগ অব্যাহত থাকতে পারে। এ সময়ে দক্ষ জনবল তৈরি, প্রযুক্তি স্থানান্তর, মান নিয়ন্ত্রণ এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধি অনুসরণের সক্ষমতা বাড়ানো সম্ভব হবে।
তৈরি পোশাক ও ওষুধশিল্পে বাড়তি গুরুত্ব
বাংলাদেশের জন্য উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানোর বিষয়টি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ তৈরি পোশাক খাতের ক্ষেত্রে। দেশের রপ্তানি আয়ের বড় অংশ আসে এ খাত থেকে। এলডিসি-সংশ্লিষ্ট অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্যসুবিধা হারানোর পর বিভিন্ন বাজারে শুল্কের চাপ বাড়লে প্রতিদ্বন্দ্বী দেশগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের পোশাকের মূল্য প্রতিযোগিতা দুর্বল হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান রপ্তানি বাজার। এলডিসি উত্তরণের পর এ বাজারে সুবিধা অব্যাহত থাকার বিষয়টি বিদ্যমান নিয়ম ও রূপান্তরকালীন ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করবে। নতুন সময়সীমা অনুমোদিত হলে বাংলাদেশের প্রস্তুতির সুযোগ বাড়বে। তবে বিদ্যমান রূপান্তরকালীন সুবিধার সঙ্গে নতুন সময়সীমার সমন্বয় কীভাবে হবে, তা সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হবে।
অন্যদিকে, ওষুধশিল্পের জন্য মেধাস্বত্বসংক্রান্ত আন্তর্জাতিক বিধিবিধান বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এসব নিয়ম অনুসরণের প্রয়োজনীয়তা বাড়লে উৎপাদন ব্যয়, গবেষণা এবং নতুন বাজারে প্রবেশের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসতে পারে। তাই বাড়তি সময়ের মধ্যে দেশীয় শিল্পের গবেষণা ও উদ্ভাবন সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি।
সুযোগ কাজে লাগাতে প্রয়োজন সংস্কার
বিশেষজ্ঞদের মতে, এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতিকাল বাড়ানো নিজে থেকেই রপ্তানি আয় বাড়াবে না কিংবা অর্থনীতির দুর্বলতা দূর করবে না। এর সুফল পেতে সরকারকে সময়ভিত্তিক কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে হবে। রপ্তানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনা, উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধি, বন্দর ও সরবরাহব্যবস্থার উন্নয়ন, জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং ব্যবসার খরচ কমানোর পাশাপাশি ব্যাংকিং ও রাজস্ব খাতে সংস্কার জরুরি।
এ ছাড়া শ্রম অধিকার, পরিবেশগত মান, পণ্যের গুণগত মান এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যবিধি অনুসরণেও অগ্রগতি প্রয়োজন। ইউরোপীয় ইউনিয়নের জিএসপি প্লাসের মতো বিকল্প বাণিজ্যসুবিধা পাওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট শর্ত পূরণ ও প্রয়োজনীয় আলোচনা এগিয়ে নিতে হবে।
তবে সময় বাড়লেই সব ধরনের বাণিজ্যসুবিধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে বহাল থাকবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। কোন সুবিধা কত দিন কার্যকর থাকবে, তা নির্ভর করবে সংশ্লিষ্ট আন্তর্জাতিক সংস্থা ও বাণিজ্য অংশীদারদের নীতিমালা ও সিদ্ধান্তের ওপর।
বাংলাদেশের আবেদনের বিষয়ে এখন জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষা। প্রস্তাবটি অনুমোদিত হলে ২০২৯ সালের ২৪ নভেম্বর পর্যন্ত এলডিসি উত্তরণের প্রস্তুতির সময় পেতে পারে বাংলাদেশ।