রেজাউল করিম, স্পেশাল করেসপন্ডেন্ট
রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং যাত্রী পরিবহনব্যবস্থা সুশৃঙ্খল করতে ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচলের নতুন নীতিমালা প্রকাশ করেছে সরকার। নীতিমালা অনুযায়ী, নিবন্ধন ও লাইসেন্স ছাড়া ঢাকা শহরসহ দেশের কোনো সিটি করপোরেশন এলাকায় ব্যাটারিচালিত রিকশা চলাচল করতে পারবে না।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় সরকার বিভাগ এ নীতিমালা প্রকাশ করে। ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ নামে প্রকাশিত এই বিধিমালা দেশের সব সিটি করপোরেশন এলাকায় প্রযোজ্য হবে।
নীতিমালায় বলা হয়েছে, ই-রিকশা নিবন্ধনের জন্য নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে আবেদন করতে হবে। আবেদনের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও জমা দিতে হবে। বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য যাচাই করে আবেদন পাওয়ার ৩০ কার্যদিবসের মধ্যে নিবন্ধন দেওয়া হবে।
প্রতিটি নিবন্ধিত ই-রিকশার জন্য কিউআর কোডযুক্ত স্বতন্ত্র নিবন্ধন নম্বর ও নম্বর প্লেট দেওয়া হবে। কিউআর কোডযুক্ত নম্বরটি যানবাহনের দৃশ্যমান স্থানে প্রদর্শন করতে হবে। নিবন্ধনের মেয়াদ হবে পাঁচ বছর।
কোনো আবেদন যাচাই-বাছাইয়ে সন্তোষজনক না হলে তা বাতিল করা যাবে। এ ক্ষেত্রে সাত কার্যদিবসের মধ্যে আবেদনকারীকে লিখিতভাবে কারণ জানাতে হবে। আবেদন বাতিলের আদেশে সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি আদেশ পাওয়ার ১০ কার্যদিবসের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে আপিল করতে পারবেন। আপিলের বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত বলে গণ্য হবে।
একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের বিপরীতে এক বা একাধিক সিটি করপোরেশন থেকে সর্বোচ্চ পাঁচটি ই-রিকশার নিবন্ধন নেওয়া যাবে। তবে এক সিটি করপোরেশনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য সিটি করপোরেশন এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে চালানো যাবে না।
বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী তৈরি নকশা ও কারিগরি বিবরণ অনুসরণ করে ফিটনেস সার্টিফিকেট নিতে হবে। সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষর ছাড়া কোনো ই-রিকশার নিবন্ধন বা নবায়ন করা যাবে না। ফিটনেস প্রদানকারী ও প্রতিস্বাক্ষরকারী প্রতিষ্ঠানকে নিবন্ধনের রেকর্ড সংরক্ষণ করতে হবে।
বর্তমানে চলাচলরত ই-রিকশাগুলোকেও বুয়েটের নির্ধারিত প্রযুক্তিগত মানদণ্ড ও নিরাপত্তাবৈশিষ্ট্য অনুযায়ী কাঠামোগত পরিবর্তন করে অনুমোদন নিতে হবে। এ জন্য সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের প্রতিস্বাক্ষরসহ ফিটনেস সার্টিফিকেট গ্রহণ করতে হবে। পর্যায়ক্রমে ই-রিকশাগুলোকে বিমার আওতায় আনার কথাও বলা হয়েছে।
প্রতিটি ই-রিকশার অর্থনৈতিক আয়ুষ্কাল হবে নিবন্ধনের তারিখ থেকে ১২ বছর। এই সময় শেষ হলে সংশ্লিষ্ট ই-রিকশার নিবন্ধন ও নম্বর প্লেট বাতিল করতে হবে। প্রতিটি যানবাহনে স্পিডোমিটার অথবা ওডোমিটার স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।
যান্ত্রিক বা নিরাপত্তাজনিত ত্রুটিযুক্ত এবং নিবন্ধনবিহীন ই-রিকশা সড়কে চালানো যাবে না। কোনো যানবাহনে ত্রুটি দেখা দিলে সামনের দৃশ্যমান স্থানে ‘যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে চলাচল অযোগ্য’ লেখা সাইনবোর্ড প্রদর্শন করে সেটি মেরামতের ব্যবস্থা নিতে হবে। অবৈধ ই-রিকশার চলাচল বন্ধে মেট্রোপলিটন এলাকার ট্রাফিক বিভাগ, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও দায়িত্বপ্রাপ্ত নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট যৌথভাবে অথবা পৃথকভাবে ব্যবস্থা নিতে পারবেন।
যেসব সড়কে চলতে পারবে না ই-রিকশা
নীতিমালা অনুযায়ী, ই-রিকশা জাতীয় মহাসড়ক, এক্সপ্রেসওয়ে, এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে, প্রধান বাস চলাচলের সড়ক বা করিডোর এবং প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া কোনো সড়কে চলাচল করতে পারবে না। ফুটপাতেও ই-রিকশা চালানো নিষিদ্ধ।
চালকদের সব সময় সড়কের বাম লেন অনুসরণ করতে হবে। গাড়ি চালানোর সময় মোবাইল ফোন ব্যবহার, নিয়মবহির্ভূত ওভারটেকিং ও লেন পরিবর্তন করা যাবে না।
ই-রিকশায় চালক ছাড়া যানবাহনের আকারভেদে সর্বোচ্চ দুই বা চারজন যাত্রী বহন করা যাবে। যাত্রীর হাতে বহনযোগ্য মালামাল ছাড়া অন্য কোনো বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহন করা যাবে না। ৪০ ডেসিবেলের বেশি শব্দের হর্ন ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
স্কুল, হাসপাতাল, ধর্মীয় উপাসনালয় ও জনবহুল এলাকায় ই-রিকশার সর্বোচ্চ গতিসীমা হবে ঘণ্টায় ১৫ কিলোমিটার।
জোনভিত্তিক রুট ও রং নির্ধারণ
ই-রিকশা চলাচলের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে রুট নির্ধারণ করবে। সিটি করপোরেশন এলাকায় জোনভিত্তিক চলাচলব্যবস্থা চালু হবে। এক জোনে নিবন্ধিত ই-রিকশা অন্য জোনে চলাচল করতে পারবে না।
ই-রিকশা নিয়ন্ত্রণের সুবিধার্থে সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন ও ট্রাফিক বিভাগ যৌথভাবে জোনের সংখ্যা, প্রতিটি জোনে ই-রিকশার সংখ্যা, চলাচলের রুট এবং নির্দিষ্ট রং চূড়ান্ত করবে।
চালকদের প্রশিক্ষণ ও পার্কিংয়ের ব্যবস্থা
নীতিমালায় চালকদের প্রশিক্ষণের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষ স্বীকৃত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে চালকদের ট্রাফিক আইন, সড়ক নিরাপত্তা, ব্যাটারি ও ই-রিকশার রক্ষণাবেক্ষণসহ প্রয়োজনীয় বিষয়ে প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে পারবে।
সংশ্লিষ্ট ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করে প্রতিটি ওয়ার্ড বা উপযুক্ত স্থানে প্রয়োজনীয়সংখ্যক পার্কিং এলাকা নির্ধারণ করবে কর্তৃপক্ষ।
চার্জিং স্টেশন ও সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার
ই-রিকশার ব্যাটারি চার্জ দিতে হবে কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত এবং সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশনের লাইসেন্সপ্রাপ্ত চার্জিং পয়েন্ট বা নির্দিষ্ট গ্যারেজে। এসব চার্জিং পয়েন্ট ও গ্যারেজে নবায়নযোগ্য জ্বালানি বা সৌরশক্তি ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখতে হবে।
সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব, বেসরকারি খাত কিংবা অন্য উপযুক্ত প্রক্রিয়ায় অনুমোদিত চার্জিং স্টেশন, গ্যারেজ ও ব্যাটারি বিনিময় কেন্দ্র স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় বিদ্যুৎ বিতরণকারী কর্তৃপক্ষ ও ট্রাফিক বিভাগের সঙ্গে পরামর্শ করতে হবে।
চার্জিং স্টেশনে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে নেট মিটারিং ব্যবস্থা চালুর কথাও বলা হয়েছে। এ ব্যবস্থায় দিনের বেলায় সৌরবিদ্যুৎ গ্রিডে সরবরাহ করে রাতে গ্রিডের বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করা যাবে। চার্জিং স্টেশন স্থাপনে প্রয়োজনীয় সরকারি অনুমোদন নিতে হবে। অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করে ব্যাটারি চার্জ করলে সংশ্লিষ্ট আইনে শাস্তির বিধান কার্যকর হবে।
ঋণ সহায়তা ও পরিবেশ সুরক্ষা
নীতিমালায় অনুমোদিত মানের ই-রিকশা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এবং সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে অর্থায়নের সুযোগ রাখা হয়েছে। সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, তফসিলি ব্যাংক ও ফাইন্যান্স কোম্পানি ই-রিকশার চালক ও মালিকদের ঋণ সহায়তা দিতে পারবে।
এ ছাড়া ই-রিকশা উৎপাদন, আমদানি, ব্যবহার, ব্যাটারি পুনঃপ্রক্রিয়াজাতকরণ ও ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ পরিবেশ সংরক্ষণ আইন, ১৯৯৫ এবং এ-সংক্রান্ত বিধিমালা ও নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে।
কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান পুরোনো বা অকার্যকর ব্যাটারি কিংবা এর অংশবিশেষ খোলা জায়গা, মাটি, জলাশয় বা সাধারণ বর্জ্যে ফেলতে কিংবা পোড়াতে পারবে না।
স্থানীয় সরকার (সিটি করপোরেশন) আইন, ২০০৯-এর ১২০ ধারায় প্রদত্ত ক্ষমতাবলে সরকার ‘সিটি করপোরেশন এলাকায় তিন চাকার স্বল্পগতির ব্যাটারিচালিত রিকশা (ই-রিকশা) চলাচল বিধিমালা, ২০২৬’ প্রণয়ন করেছে।