বিপাকে ফকিরহাটের লক্ষাধিক মানুষ
এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির | বাগেরহাট
দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের বিশ্ব ঐতিহ্য সুন্দরবন উপকূলে নিষিদ্ধ নেটজাল দিয়ে অবাধে গলদা ও বাগদা চিংড়ির রেণু পোনা শিকারের মহোৎসব চলছে। অসাধু চক্রের এমন কর্মকাণ্ডে একদিকে সুন্দরবনের মৎস্যসম্পদ ও জলজ জীববৈচিত্র্য চরম হুমকির মুখে পড়ছে, অন্যদিকে রেণু পোনার তীব্র সংকটে বাগেরহাটের ফকিরহাট উপজেলার লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা সংকটের মুখে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টদের তথ্যমতে, সুন্দরবনের অভ্যন্তরে সব ধরনের মাছের রেণু আহরণ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। কিন্তু সরকারি এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে প্রশাসনের নাকের ডগা দিয়েই বাগেরহাটের মোংলার পশুর নদী, শ্যালা নদীসহ আশপাশের বনের অভ্যন্তরে প্রকাশ্যে নেটজাল দিয়ে রেণু পোনা ধরা হচ্ছে।
১টি চিংড়ির রেণুর জন্য ধ্বংস হচ্ছে ২০০টি মাছের পোনা
পরিবেশবিদ ও মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী থেকে নেটজালের মাধ্যমে আহরণের পর কেবল গলদা ও বাগদা চিংড়ির রেণু আলাদা করে রাখা হয়। বাকি অন্য প্রজাতির সব রেণু ও জলজ প্রাণীর লার্ভা তীরে বা নদীতে ফেলে দেওয়া হয়, যা কিছুক্ষণ পরই মারা যায়।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) মোংলা অঞ্চলের আহ্বায়ক শেখ নুর আলম গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন:
"বন বিভাগ, কোস্টগার্ড, নৌপুলিশ ও প্রশাসনের সামনেই শত শত নৌকায় নিষিদ্ধ নেট জাল ফেলে এই ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হচ্ছে। এক শ্রেণির অসাধু ব্যবসায়ী ক্ষণস্থায়ী মুনাফার স্বার্থে এই কাজ করছে। তারা মাত্র একটি চিংড়ির রেণু আহরণ করতে গিয়ে অন্য জাতের অন্তত ২০০টি মাছের পোনা ধ্বংস করছে। এতে একদিকে মৎস্যসম্পদ উজাড় হচ্ছে, অন্যদিকে দেশের পুষ্টির চাহিদাও ব্যাহত হচ্ছে।"
কোটি কোটি টাকার অবৈধ বাজার
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মোংলার সুন্দরতলা, বিউটি মার্কেট এবং চিলা বাজার এলাকায় প্রতিদিন নিয়ম করে ৮ থেকে ১০ কোটি টাকার অবৈধ বাগদা ও গলদা রেণু পোনা কেনাবেচা হচ্ছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ চাষিরা যেমন ন্যায্য মূল্যে ভালো পোনা পাচ্ছেন না, তেমনি সুন্দরবনের প্রাকৃতিক মৎস্য ভাণ্ডারও শূন্য হয়ে পড়ছে। যার সরাসরি প্রভাব পড়ছে ফকিরহাটের বিপুলসংখ্যক চিংড়ি চাষি ও শ্রমিকের ওপর।
নজরদারির দাবি, নিয়মিত অভিযানের আশ্বাস
অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসনের দৃশ্যমান কোনো তৎপরতা না থাকায় জেলেরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে। তবে নিয়মিত অভিযান চালানোর দাবি করেছে স্থানীয় মৎস্য বিভাগ ও কোস্টগার্ড।
উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তার বক্তব্য: মোংলা উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. জাহিদ হোসেন জানান, "মোংলার পশুর নদী এবং শ্যালা নদীর রামপাল অংশ থেকে শুরু করে হারবাড়িয়া পর্যন্ত আমাদের নিয়মিত যৌথ অভিযান চলছে। কোস্টগার্ড ও নৌবাহিনী আমাদের সার্বিক সহায়তা দিচ্ছে। পাশাপাশি জেলেদের সচেতন করার কাজও অব্যাহত আছে।"
কোস্টগার্ডের বক্তব্য: বাগেরহাট কোস্টগার্ড পশ্চিম জোনের অপারেশন কর্মকর্তা মো. তারেক আহমেদ বলেন, "পশুর চ্যানেলে সব ধরনের রেণু তোলা আইনত দণ্ডনীয়। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে আমরা প্রতিনিয়ত অভিযান চালাচ্ছি এবং অবৈধ জাল জব্দ করছি।"
সুন্দরবনের এই বিশাল প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা এবং ফকিরহাটের লক্ষাধিক মানুষের জীবিকা নিশ্চিত করতে কেবল কাগজে-কলমে নিষেধাজ্ঞা নয়, বরং মাঠপর্যায়ে কঠোর আইনি প্রয়োগ ও অবৈধ বাজারগুলো বন্ধ করা জরুরি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট সচেতন মহল।