নিজস্ব প্রতিবেদক
অনলাইন জুয়া, বেটিং, ম্যাচ ফিক্সিং ও ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক জুয়া দমনে কঠোর শাস্তির বিধান রেখে ‘জুয়া প্রতিরোধ আইন-২০২৬’ জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। নতুন আইনে অনলাইন বেটিংয়ের অপরাধে সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বিলটি পাসের জন্য উত্থাপন করলে কণ্ঠভোটে তা সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয়। অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ।
এর আগে গত ২৩ জুন বিলটি সংসদে উত্থাপন করা হলে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়-সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে পাঠানো হয়। কমিটির সুপারিশের ভিত্তিতে বিলটি পাস করা হয়।
নতুন আইনে জুয়া, অনলাইন জুয়া, বেটিং, বাজিকর, ম্যাচ ফিক্সিং, স্পট ফিক্সিং, ক্রিপ্টোকারেন্সিসহ ২৪ ধরনের বিষয়কে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে। অপরাধের ধরন অনুযায়ী ১৪ ধরনের কারাদণ্ড, অর্থদণ্ড অথবা উভয় দণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
আইনের উদ্দেশ্য ও কারণ-সংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, ১৮৬৭ সালের ‘দ্য পাবলিক গ্যাম্বলিং অ্যাক্ট’ বর্তমান ডিজিটাল যুগের অনলাইন জুয়া, স্পোর্টস বেটিং, ভার্চুয়াল ক্যাসিনো ও ক্রিপ্টোকারেন্সিভিত্তিক অপরাধ মোকাবিলায় অকার্যকর হয়ে পড়েছে। তাই পুরোনো আইন বাতিল করে আধুনিক ও কঠোর আইন প্রণয়ন করা হয়েছে।
নতুন আইনে সাধারণ জুয়ার অপরাধে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড বা দুই লাখ টাকা জরিমানা, অনলাইন জুয়ার ক্ষেত্রে পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা এবং অনলাইন বেটিংয়ের জন্য সাত বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
এছাড়া জুয়ার আসর পরিচালনা, নিয়ন্ত্রণ বা ব্যবহারের অপরাধে সর্বোচ্চ পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও চার লাখ টাকা জরিমানার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট ভবন, যানবাহন, সার্ভার বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করা যাবে। জুয়ার সরঞ্জাম সংরক্ষণ, প্রস্তুত, সরবরাহ বা বিক্রির জন্য সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রয়েছে।
আইনে ম্যাচ ফিক্সিংয়ের জন্য সর্বোচ্চ সাত বছরের কারাদণ্ড ও এক কোটি টাকা জরিমানা এবং স্পট ফিক্সিংয়ের জন্য পাঁচ বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। আদালত প্রয়োজনে দোষী ব্যক্তিকে নির্দিষ্ট সময়ের জন্য বা স্থায়ীভাবে সংশ্লিষ্ট খেলাধুলায় অংশগ্রহণে অযোগ্য ঘোষণা করতে পারবেন।
জুয়া-সংক্রান্ত বিজ্ঞাপন, বিভ্রান্তিকর প্রচারণা, স্পন্সরশিপ, অ্যাফিলিয়েট মার্কেটিং বা রেফারেল ক্যাম্পেইন পরিচালনার দায়ে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম, ইনফ্লুয়েন্সার, শিল্পী বা খেলোয়াড়কে সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড ও ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা যাবে।
ভিপিএন, প্রক্সি, মিরর সাইট, ক্লাউড অবকাঠামো কিংবা ভুয়া সিম ও এমএফএস অ্যাকাউন্ট ব্যবহার করে জুয়া পরিচালনার জন্যও কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে। সংঘবদ্ধভাবে বা অর্থপাচারের উদ্দেশ্যে এ ধরনের অপরাধ করলে সর্বোচ্চ ১০ বছরের কারাদণ্ড ও পাঁচ কোটি টাকা জরিমানা করা যাবে।
আইনে আরও বলা হয়েছে, জুয়ার অর্থ ব্যাংক, মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস), ডিজিটাল ওয়ালেট, হুন্ডি বা ক্রিপ্টোকারেন্সির মাধ্যমে লেনদেন বা বৈধ করার চেষ্টা করলে তা মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর আওতায় সম্পৃক্ত অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
এছাড়া জুয়া পরিচালনায় ব্যবহৃত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস অ্যাকাউন্ট, ডিজিটাল ওয়ালেট, ক্রিপ্টো সম্পদ, সার্ভার, ডোমেইন, সিম ও অন্যান্য সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার ক্ষমতা আদালতকে দেওয়া হয়েছে। অনলাইন জুয়া ও বেটিং-সংক্রান্ত অপরাধের বিচার হবে সাইবার ট্রাইব্যুনালে, আর অন্যান্য অপরাধের বিচার হবে এখতিয়ারসম্পন্ন ফৌজদারি আদালতে।
নতুন আইনের আওতায় সব অপরাধ আমলযোগ্য, জামিন অযোগ্য ও আপস অযোগ্য হিসেবে গণ্য হবে। একই সঙ্গে সরকার জনস্বার্থে জুয়া ও বেটিং-সংশ্লিষ্ট ওয়েবসাইট, মোবাইল অ্যাপ, সার্ভার, ডোমেইন, আইপি অ্যাড্রেস এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পেজ বা চ্যানেল ব্লক বা নিষিদ্ধ করতে পারবে। পাশাপাশি জুয়া প্রতিরোধে জাতীয় ডিজিটাল ব্ল্যাকলিস্ট, এনআইডি-সিম-এমএফএস সংযুক্তি ব্যবস্থা এবং সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর সমন্বয়ে একটি আন্তঃসংস্থা টাস্কফোর্স গঠনের বিধানও রাখা হয়েছে।