মোঃ রাজিব মন্ডল, স্টাফ রিপোর্টার
প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে বিশ্বজুড়ে উদ্যোগ চললেও ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রয়োজনীয় গতিতে এগোচ্ছে না কার্যক্রম। এ লক্ষ্য পূরণে বছরে প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে বিনিয়োগ বর্তমানের ৬৪ বিলিয়ন ডলার থেকে বাড়িয়ে ২৯৬ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত করতে হবে। অর্থাৎ আগামী চার বছরে বার্ষিক অর্থায়ন চার গুণেরও বেশি বাড়ানোর তাগিদ দিয়েছে জাতিসংঘ।
বৃহস্পতিবার (২৯ অক্টোবর) প্রকাশিত ‘নেচারস কামব্যাক—স্কেলিং ইকোসিস্টেম রেস্টোরেশন ফর পিপল অ্যান্ড প্ল্যানেট’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। জাতিসংঘের পরিবেশবিষয়ক সংস্থা ইউএনইপি, খাদ্য ও কৃষি সংস্থা এফএও এবং জীববৈচিত্র্যবিষয়ক কনভেনশনের সচিবালয় যৌথভাবে প্রতিবেদনটি প্রকাশ করেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিশ্বের ১৪৯টি দেশে প্রায় ২৫ কোটি ২০ লাখ হেক্টর এলাকায় প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম চলছে। এসব উদ্যোগের সঙ্গে যুক্ত হয়ে ইতিমধ্যে ১০ লাখের বেশি পরিবেশবান্ধব কর্মসংস্থান তৈরি হয়েছে। তবে ২০৩০ সালের বৈশ্বিক লক্ষ্য অর্জনে স্থলভিত্তিক বাস্তুতন্ত্রের পাশাপাশি মিঠাপানির জলাভূমি, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় পরিবেশ পুনরুদ্ধারে আরও জোর দিতে হবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের আওতায় থাকা নথিভুক্ত এলাকার মধ্যে এশিয়ার পরিমাণ সবচেয়ে বেশি—১৯ কোটি ২২ লাখ হেক্টর। এরপর আফ্রিকায় ৩ কোটি ৬৩ লাখ, ইউরোপে ৯১ লাখ, উত্তর ও মধ্য আমেরিকায় ৫৮ লাখ, দক্ষিণ আমেরিকায় ৫৪ লাখ এবং ওশেনিয়ায় ৩২ লাখ হেক্টর এলাকায় এ কার্যক্রম চলছে।
তবে পুনরুদ্ধারের আওতাভুক্ত এলাকার আয়তন দিয়ে কোনো অঞ্চলকে সবচেয়ে সফল বলা যাবে না। কারণ, অঞ্চলগুলোর আয়তন, উদ্যোগের বিস্তার এবং তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির সক্ষমতায় পার্থক্য রয়েছে।
প্রতিবেদনে জলজ বাস্তুতন্ত্র পুনরুদ্ধারের ধীরগতিকে বিশেষ উদ্বেগের বিষয় হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। বিশ্বের ৬২টি দেশে ১ কোটি ১০ লাখ হেক্টর মিঠাপানির বাস্তুতন্ত্র এবং ৪৬টি দেশে ৫৭ লাখ হেক্টর সামুদ্রিক ও উপকূলীয় এলাকা পুনরুদ্ধারের আওতায় রয়েছে।
এসব বাস্তুতন্ত্র দ্রুত অবক্ষয়ের শিকার হলেও পুনরুদ্ধারের কার্যক্রম সম্পর্কে তথ্য তুলনামূলকভাবে সীমিত। ফলে বাস্তবে চলমান উদ্যোগের পরিমাণ প্রতিবেদনে উঠে আসা হিসাবের চেয়েও বেশি হতে পারে।
জাতিসংঘের বৈশ্বিক লক্ষ্য অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে অবক্ষয়িত স্থলভাগ, মিঠাপানির জলাভূমি, সামুদ্রিক ও উপকূলীয় বাস্তুতন্ত্রের অন্তত ৩০ শতাংশকে কার্যকর পুনরুদ্ধারের আওতায় আনতে হবে। এ ক্ষেত্রে শুধু গাছ লাগানো নয়, ক্ষতিগ্রস্ত বাস্তুতন্ত্রের স্বাভাবিক কার্যকারিতা ফিরিয়ে আনা এবং দীর্ঘমেয়াদে তা সংরক্ষণ করাও জরুরি।
বাংলাদেশের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রকৃতি পুনরুদ্ধার
নদ-নদী, হাওর, জলাভূমি, বন ও উপকূলীয় এলাকার ওপর বাংলাদেশের মানুষের জীবিকা, কৃষি, মৎস্যসম্পদ এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলার সক্ষমতা অনেকাংশে নির্ভরশীল। এসব এলাকার বাস্তুতন্ত্র ক্ষতিগ্রস্ত হলে খাদ্য উৎপাদন, পানি ব্যবস্থাপনা, জীববৈচিত্র্য ও স্থানীয় মানুষের আয়ের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের খরাপ্রবণ বরেন্দ্র অঞ্চল, হাওরাঞ্চলের জলাভূমি এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলীয় বনভূমি পুনরুদ্ধারেও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে উপকূলীয় ম্যানগ্রোভ বন সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধার জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকি মোকাবিলা, জীববৈচিত্র্য রক্ষা এবং স্থানীয় মানুষের জীবিকা উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে।
এফএওর তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশসহ ছয়টি দেশে বন ও ভূদৃশ্য পুনরুদ্ধার কার্যক্রম সম্প্রসারণে কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের ২২টি দেশ ২০৩০ সালের মধ্যে সম্মিলিতভাবে অন্তত ১০ কোটি হেক্টর অবক্ষয়িত ভূদৃশ্য পুনরুদ্ধারের উদ্যোগে যুক্ত হয়েছে।
তবে জাতিসংঘের নতুন বৈশ্বিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জন্য আলাদা করে কত হেক্টর এলাকা পুনরুদ্ধার হয়েছে বা এ লক্ষ্য অর্জনে কত অর্থ প্রয়োজন, তার নির্দিষ্ট হিসাব দেওয়া হয়নি।
কোন খাতে কত বিনিয়োগ প্রয়োজন
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০৩০ সালের লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে প্রকৃতি পুনরুদ্ধারে বার্ষিক বিনিয়োগ বাড়িয়ে ২৯৬ বিলিয়ন ডলারে নিতে হবে। বিনিয়োগের বড় অংশ প্রয়োজন কৃষিবনায়ন, পুনরুদ্ধারভিত্তিক বনায়ন, পিটল্যান্ড বা পিটসমৃদ্ধ জলাভূমি এবং সামুদ্রিক ঘাস পুনরুদ্ধারে।
এ ক্ষেত্রে কৃষিবনায়নে বছরে আনুমানিক ৮৭ বিলিয়ন ডলার, পুনরুদ্ধারভিত্তিক বনায়নে ৫২ বিলিয়ন ডলার, পিটল্যান্ড পুনরুদ্ধারে ৪৪ বিলিয়ন ডলার এবং সামুদ্রিক ঘাস পুনরুদ্ধারে ২৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে। <Cite refs=
জাতিসংঘের প্রতিবেদনে প্রকৃতি পুনরুদ্ধারকে শুধু পরিবেশগত ব্যয় হিসেবে না দেখে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, খাদ্য ও পানির নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষতি মোকাবিলার বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রতিবেদনের পূর্বাভাস অনুযায়ী, প্রয়োজনীয় বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে আরও প্রায় ৩ কোটি ২০ লাখ কর্মসংস্থান তৈরি হতে পারে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এ লক্ষ্য অর্জনে সরকারি বরাদ্দ, উন্নয়ন সহযোগীদের অর্থায়ন, বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। একই সঙ্গে প্রকৃতি পুনরুদ্ধারের অগ্রগতি পরিমাপ, অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত এবং প্রকল্পগুলোর দীর্ঘমেয়াদি সুফল মূল্যায়নে স্বচ্ছ তথ্য ও নিয়মিত পর্যবেক্ষণ প্রয়োজন।