গালিবা আনতারা সোয়ারা
২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত জাতীয় বাজেট জাতীয় সংসদে উপস্থাপিত হয়েছে ১১ জুন। প্রায় ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার এ বাজেট দেশের ইতিহাসে সবচেয়ে বড়। বাজেট নিয়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যেই বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে সিগারেটের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়টি।
প্রথম দৃষ্টিতে এটি রাজস্ব বা অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত মনে হলেও বাস্তবে এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে জনস্বাস্থ্য, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখার প্রশ্ন। বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ধূমপান একটি বড় জনস্বাস্থ্য সমস্যা হিসেবে বিবেচিত হয়। চিকিৎসাবিজ্ঞান দীর্ঘদিন ধরেই প্রমাণ করে আসছে, ধূমপান ফুসফুসের ক্যানসার, হৃদরোগ, স্ট্রোক, উচ্চ রক্তচাপ এবং শ্বাসতন্ত্রের নানা জটিল রোগের অন্যতম কারণ।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা-এর তথ্য অনুযায়ী, প্রতিবছর বিশ্বে ৮০ লাখেরও বেশি মানুষের মৃত্যু ঘটে তামাকজাত পণ্য ব্যবহারের কারণে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ পরোক্ষ ধূমপানের শিকার।
এ বাস্তবতায় বিশ্বের অনেক দেশ তামাক নিয়ন্ত্রণে কর ও মূল্যবৃদ্ধির নীতি গ্রহণ করেছে। অস্ট্রেলিয়া, যুক্তরাজ্য, কানাডা, ফ্রান্স এবং নিউজিল্যান্ড-এর অভিজ্ঞতা দেখায়, তামাকপণ্যের ওপর কর বৃদ্ধি ধূমপানের হার কমাতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে।
প্রস্তাবিত বাজেটে প্রতি ১০ শলাকার নিম্নস্তরের সিগারেটের মূল্য ৬০ টাকা থেকে ৬২ টাকা, মধ্যম স্তরের ৮০ টাকা থেকে ৯২ টাকা, উচ্চ স্তরের ১৪০ টাকা থেকে ১৬০ টাকা এবং অতি উচ্চ স্তরের ১৮৫ টাকা থেকে ২১০ টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে। এর ফলে বিভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটের খুচরা মূল্য বাস্তবে আরও বেশি বৃদ্ধি পেতে পারে।
তবে প্রশ্ন হচ্ছে, শুধু মূল্যবৃদ্ধিই কি ধূমপান কমাতে যথেষ্ট? দীর্ঘদিনের আসক্ত ধূমপায়ীরা অনেক ক্ষেত্রে বাড়তি খরচ মেনেও ধূমপান চালিয়ে যান। ফলে কর বৃদ্ধি ও মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি প্রয়োজন ব্যাপক জনসচেতনতা, তামাকবিরোধী শিক্ষা কার্যক্রম এবং বিদ্যমান আইন কঠোরভাবে বাস্তবায়ন।
অর্থনৈতিক দিক থেকেও ধূমপানের প্রভাব কম নয়। প্রতিদিন কয়েকটি সিগারেটের জন্য অতিরিক্ত ব্যয় মাস শেষে উল্লেখযোগ্য অঙ্কে পরিণত হয়। একজন ধূমপায়ী বছরে যে অর্থ সিগারেটের পেছনে ব্যয় করেন, সেই অর্থ শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, পুষ্টি কিংবা সঞ্চয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে ব্যবহার করা সম্ভব।
বিশেষ করে তরুণ সমাজের মধ্যে ধূমপানের প্রবণতা উদ্বেগজনক। জীবনের সৃজনশীল সময় গবেষণা, উদ্ভাবন ও দক্ষতা অর্জনে ব্যয় করার পরিবর্তে অনেকেই নিকোটিনের আসক্তির ফাঁদে আটকে পড়ছেন। স্বল্পমেয়াদি আনন্দের বিনিময়ে তারা দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যঝুঁকি ডেকে আনছেন।
তাই ধূমপান নিয়ন্ত্রণে মূল্যবৃদ্ধি একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হলেও এটিকে একমাত্র সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। জনসচেতনতা বৃদ্ধি, তামাকবিরোধী প্রচার, তরুণদের মধ্যে প্রতিরোধমূলক শিক্ষা এবং আইনের কার্যকর প্রয়োগের সমন্বিত উদ্যোগই পারে একটি সুস্থ সমাজ গড়ে তুলতে।
ধূমপান থেকে নিজেকে এবং অন্যকে সুরক্ষিত রাখা শুধু ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়, এটি সামাজিক দায়িত্বও। একটি ভালো অভ্যাস যেমন জীবন বদলে দিতে পারে, তেমনি একটি ক্ষতিকর অভ্যাসও একটি প্রজন্মের সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
লেখক: গালিবা আনতারা সোয়ারা
শিক্ষার্থী, গোপালগঞ্জ বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।