মুহা. সিয়াম
আমাদের দেশের গ্রামবাংলার পরিচিত বুনো উদ্ভিদগুলোর মধ্যে অন্যতম লজ্জাবতী। একসময় পথের ধারে, মাঠের আইলে কিংবা ঝোপঝাড়ে চোখে পড়ত এই ছোট্ট গাছটি। সামান্য স্পর্শ পেলেই এর পাতা মুহূর্তে বন্ধ হয়ে যায় এবং ডালপালা নুয়ে পড়ে। এই অনন্য বৈশিষ্ট্যের কারণেই উদ্ভিদটি সবার কাছে পরিচিত ‘লজ্জাবতী’ নামে।
লজ্জাবতী ফুল ছোট, গোলাকার ও তুলোর মতো নরম। সাধারণত গোলাপি কিংবা হালকা বেগুনি রঙের হয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে এটি লাজবন্তী, লজ্জালু বা লাজলু নামেও পরিচিত। ইংরেজিতে এর নাম Sensitive Plant, Sleepy Plant বা Touch-me-not। এর বৈজ্ঞানিক নাম Mimosa pudica।
বিজ্ঞানীদের মতে, লজ্জাবতীর পাতার গোড়ায় থাকা বিশেষ ধরনের কোষ স্বাভাবিক অবস্থায় পানিপূর্ণ থাকে। ফলে পাতাগুলো প্রসারিত থাকে। স্পর্শ পেলে কোষের ভেতরের পানি দ্রুত সরে যায়, কোষগুলো চুপসে যায় এবং পাতা নুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণ পর কোষ আবার পানিপূর্ণ হলে পাতা স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে আসে।
লজ্জাবতীর আদি নিবাস মধ্য আমেরিকার মেক্সিকো। তবে বর্তমানে বিশ্বের প্রায় সব উষ্ণ অঞ্চলে এ উদ্ভিদ ছড়িয়ে পড়েছে। বাংলাদেশেও এটি বহুল পরিচিত একটি বুনো গাছ। গাছটি মাটির ওপর গড়িয়ে বাড়ে এবং গাঁট থেকে শিকড় বের করে মাটি আঁকড়ে ধরে। এর কাণ্ডে ছোট ছোট বাঁকা কাঁটা থাকে।
লজ্জাবতীর ভেষজ গুণও কম নয়। লোকজ চিকিৎসায় এর শিকড়, পাতা ও ডালপালা বিভিন্ন রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। চর্মরোগ, আমাশয়, ক্ষত নিরাময়, কফ দূরীকরণ এবং নাক-কান দিয়ে রক্ত পড়া বন্ধ করতে এটি ব্যবহারের প্রচলন রয়েছে। এছাড়া উদ্ভিদটি মাটিতে নাইট্রোজেন স্থিরীকরণে সহায়তা করে, ফলে জমির উর্বরতা বৃদ্ধিতেও ভূমিকা রাখতে পারে।
বারো মাসই লজ্জাবতীতে ফুল ও ফল দেখা যায়, তবে আষাঢ় থেকে পৌষ মাসে ফুল-ফল বেশি হয়। প্রতিটি ফলে সাধারণত ৩ থেকে ৪টি বীজ থাকে।
প্রকৃতির এই লাজুক ফুল একসময় গ্রামবাংলার চিরচেনা দৃশ্য ছিল। নগরায়ণ, রাসায়নিক ব্যবহার এবং প্রাকৃতিক পরিবেশের পরিবর্তনের কারণে এখন আগের মতো চোখে পড়ে না লজ্জাবতী। তবুও সামান্য স্পর্শে লজ্জায় মুখ লুকানো এই ছোট্ট উদ্ভিদ আজও প্রকৃতিপ্রেমীদের মুগ্ধ করে।