আন্তর্জাতিক ডেস্ক
ইরানে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে ১৬ বছর বয়সী একমাত্র মেয়ে সেভদাকে হারিয়েছেন সামিরা। মেয়ের মরদেহ খুঁজে পাওয়া, দাফনের অনুমতি আদায় থেকে শুরু করে প্রতিটি ধাপে কর্তৃপক্ষের হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ তার। শেষ পর্যন্ত প্রাণের ঝুঁকি নিয়ে দেশ ছাড়তে বাধ্য হন তিনি। এখন নির্বাসিত জীবন থেকেই মেয়ের হত্যার জন্য দায়ীদের পরিচয় প্রকাশ এবং তাদের বিচারের মুখোমুখি করতে লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন এই মা।
বিবিসি প্যানোরামাকে সামিরা জানান, আগে রাজনীতি নিয়ে তেমন আগ্রহ ছিল না তার। ইরানে প্রসাধনী বিক্রি করতেন। কিন্তু চলতি বছরের জানুয়ারিতে সরকারবিরোধী বিক্ষোভে মেয়ের মৃত্যুর পর তার জীবন বদলে যায়। মেয়ের মরদেহ খুঁজতে গিয়ে হাসপাতাল ও বিভিন্ন মর্গে ঘুরতে হয়েছে তাকে। সামিরার ভাষায়, সেভদাকে খুঁজে পাওয়াই ছিল না লড়াইয়ের শেষ, বরং সেখান থেকেই শুরু হয় হয়রানির নতুন অধ্যায়।
গত ৯ জানুয়ারি তেহরানের উপকণ্ঠে মায়ের সঙ্গে বিক্ষোভে অংশ নেয় সেভদা। আগের মাসে অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া আন্দোলন একপর্যায়ে ইসলামি প্রজাতন্ত্রের অবসানের দাবিতে রূপ নেয়। সেভদা মাহসা আমিনি ও নিকা শাকারামিকে আদর্শ মনে করত। বাধ্যতামূলক হিজাব আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে গ্রেপ্তারের পর পুলিশ হেফাজতে মাহসার মৃত্যু এবং পরবর্তী আন্দোলনে নিকার মৃত্যুর ঘটনা তাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করেছিল।
সামিরা জানান, নির্বাসিত ইরানের সাবেক শাহের ছেলে রেজা পাহলভির আহ্বানে সাড়া দিয়ে ৮ জানুয়ারি মা-মেয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন। পরদিনও বিক্ষোভে অংশ নেন তারা। বিক্ষোভস্থলে সেভদা একটি ময়লার ঝুড়ির ওপর দাঁড়িয়ে স্লোগান দিচ্ছিল। এ সময় বাসিজ বাহিনী ও ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) সদস্যরা সেখানে অবস্থান করছিলেন।
সামিরার অভিযোগ, একপর্যায়ে পাশের একটি ভবনের ছাদ থেকে স্নাইপারের গুলি ছোড়া হয়। সেই গুলি সেভদার হৃদপিণ্ড ভেদ করে বেরিয়ে যায়। মেয়েকে রক্তাক্ত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন তিনি। পরে হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকেরা অস্ত্রোপচারের কথা জানান। কিন্তু কিছুক্ষণ পর তিনি দেখতে পান, মেয়ের মরদেহ একটি ব্যাগে ঢুকিয়ে রাখা হয়েছে।
এরপর কয়েক দিন ধরে হাসপাতাল ও বিভিন্ন মর্গে মেয়ের মরদেহ খুঁজতে হয় তাকে। শেষ পর্যন্ত তেহরানের একটি বড় মর্গে সেভদাকে শনাক্ত করেন। সামিরার বর্ণনা অনুযায়ী, মেয়ের মরদেহের ওপর আরও তিনটি মরদেহ স্তূপ করে রাখা হয়েছিল। সেখানে অসংখ্য কিশোর-কিশোরীর মরদেহ দেখে ভেঙে পড়েন তিনি।
ইরানি কর্তৃপক্ষ বিক্ষোভে তিন হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর কথা স্বীকার করেছে। তবে নিহতদের মধ্যে নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরাও ছিলেন বলে দাবি তাদের। অন্যদিকে মানবাধিকার সংগঠন হরানার হিসাবে, নিহতের সংখ্যা সাত হাজার ছাড়িয়েছে। সংগঠনটির দাবি, নিহতদের অধিকাংশই বিক্ষোভকারী।
মেয়ের মরদেহ পাওয়ার পরও হয়রানি থেকে রেহাই পাননি সামিরা। তার অভিযোগ, সেভদাকে দাফনের অনুমতি পেতে কর্তৃপক্ষের চাপের মুখে বলতে হয়েছিল, নিরাপত্তা বাহিনী নয়, সন্ত্রাসীরা তাকে হত্যা করেছে। ইসরায়েলি ও মার্কিন সন্ত্রাসীদের হাতে স্বজনেরা নিহত হয়েছেন—এমন বক্তব্য দিয়ে পরিবারগুলোকে চুপ করানোর চেষ্টা করা হয়েছিল বলে দাবি তার। এমনকি দাফনের পর মেয়ের কবর দেখতে যাওয়া কিংবা সমাধিফলক বসানোর অনুমতিও পাননি।
সেভদার মৃত্যুর ৪০ দিন পূর্তির কয়েক দিন আগে গোয়েন্দা মন্ত্রণালয়ের স্থানীয় কার্যালয়ে ডেকে পাঠানো হয় সামিরাকে। সেখানে কর্মকর্তারা তাকে একটি সাক্ষাৎকার দিতে বলেন। ওই সাক্ষাৎকারে সেভদাকে বাসিজ বাহিনীর সদস্য হিসেবে তুলে ধরে বলতে বলা হয়েছিল, বিক্ষোভকারীদের হাতে তার মৃত্যু হয়েছে। বিনিময়ে মেয়েকে শহীদ ঘোষণা, বাড়ি ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ করেন তিনি।
এরপর ইরান ছাড়ার সিদ্ধান্ত নেন সামিরা। পাচারকারীদের সহায়তায় নদী ও পাহাড় পেরিয়ে পায়ে হেঁটে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যান। বিদেশে আশ্রয় নেওয়ার পর বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমকে সাক্ষাৎকার দেন তিনি। সামিরার দাবি, এরপর তার বিরুদ্ধে অনুপস্থিতিতে একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। এর মধ্যে ‘মোহারেবেহ’ বা স্রষ্টার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার অভিযোগও রয়েছে, যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
সেভদার ১৭তম জন্মদিন উপলক্ষে ইরানে আত্মীয়স্বজন ও বন্ধুরা একটি স্মরণসভার আয়োজন করেছিলেন। বিদেশ থেকে সরাসরি সম্প্রচারের মাধ্যমে অনুষ্ঠানটি দেখছিলেন সামিরা। কিন্তু হঠাৎ সম্প্রচার বন্ধ হয়ে যায়। পরে জানতে পারেন, আইআরজিসি সেখানে অভিযান চালিয়ে তার কয়েকজন আত্মীয় ও বন্ধুকে আটক করেছে। মেয়ের কবর ঘিরে আর কোনো জমায়েত হলে মরদেহ তুলে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ার হুমকিও দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ তার।
বর্তমানে অনলাইনে ইরানের নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্য ও কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ করছেন সামিরা। ৮ ও ৯ জানুয়ারির বিক্ষোভে প্রাণঘাতী গুলি চালানোর জন্য যাদের দায়ী মনে করেন, তাদের পরিচয় সামনে আনাই তার লক্ষ্য। তিনি বলেন, যাদের নাম প্রকাশ করছেন, প্রত্যেকের বিরুদ্ধে বিচার নিশ্চিত করতে চান।
বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সামিরার প্রকাশ করা নামের একজন পরে নিহত হলে ইরান সরকারের এক সমর্থক তার অবস্থান জানাতে পাঁচ হাজার ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেন। ওই সমর্থকের ধারণা ছিল, ওই ব্যক্তির মৃত্যুর জন্য সামিরা দায়ী। তবে ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম পরে ওই হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় নয়জনকে গ্রেপ্তারের খবর প্রকাশ করে।
মেয়েকে হারানোর শোক এখনো প্রতিদিন তাড়া করে বেড়ায় সামিরাকে। তবু থামতে চান না তিনি। তার ভাষায়, মেয়েকে ছাড়া প্রতিটি দিন ও মুহূর্ত অসহনীয়। কিন্তু সেভদার মৃত্যু তাকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানোর শক্তি দিয়েছে। মেয়ের মরদেহ খুঁজতে গিয়ে মর্গে যেসব দৃশ্য দেখেছেন, সেগুলোই তাকে শেষ নিঃশ্বাস পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাওয়ার প্রেরণা জোগাচ্ছে।
ইরান সরকারের বক্তব্য: বিবিসি প্যানোরামাকে দেওয়া বক্তব্যে লন্ডনে অবস্থিত ইরানি দূতাবাস বলেছে, শান্তিপূর্ণ ও বৈধ বিক্ষোভকে যুক্তরাষ্ট্রসহ বিদেশি শক্তিগুলো সহিংসতায় রূপ দিয়েছিল। তাদের দাবি, বিদেশি শক্তিগুলো সহিংসতা উসকে দেওয়ার পাশাপাশি অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করে জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করেছে।
সূত্র: বিবিসি