রয়টার্স
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প।
ছবি:
ইরানের বিরুদ্ধে সামরিক অভিযান আরও জোরদার করার ইঙ্গিত দিয়ে নতুন করে ঝুঁকির মুখে পড়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। বিশ্লেষকদের মতে, অতীতের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে সামরিক চাপ তেহরানকে ছাড় দিতে বাধ্য করতে পারেনি; বরং নতুন হামলা মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত আরও বিস্তৃত করতে পারে।
রয়টার্সের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এক মাস আগে হওয়া অন্তর্বর্তী যুদ্ধবিরতি ভেঙে যাওয়ার পর ট্রাম্প প্রশাসন আবারও ইরানের ওপর চাপ বাড়ানোর পথে হাঁটছে। ওয়াশিংটনের লক্ষ্য হরমুজ প্রণালিতে ইরানের প্রভাব কমানো এবং তেহরানকে যুক্তরাষ্ট্রের শর্তে আলোচনায় ফিরিয়ে আনা।
যদিও এখনো পূর্ণমাত্রার যুদ্ধ শুরু হয়নি, তবু কূটনৈতিক সমাধানের সম্ভাবনা ক্রমেই ক্ষীণ হচ্ছে। এরই মধ্যে বৈশ্বিক তেলের দাম বেড়েছে এবং আন্তর্জাতিক আর্থিক বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রতিশোধমূলক হামলা টানা ষষ্ঠ দিনেও অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ইরান সতর্ক করেছে, যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলা চালালে ইয়েমেনের হুথি মিত্রদের মাধ্যমে লোহিত সাগরের প্রবেশমুখে অবস্থিত গুরুত্বপূর্ণ বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত করা হতে পারে।
মার্কিন গণমাধ্যম ও রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে ইরানের জ্বালানি স্থাপনা, গুরুত্বপূর্ণ সেতু, খার্গ দ্বীপের তেল রপ্তানি কেন্দ্র এবং গভীর ভূগর্ভস্থ পারমাণবিক সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলার সম্ভাবনাও আলোচনা হয়েছে। তবে এসব পদক্ষেপকে অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
মধ্যপ্রাচ্যবিষয়ক সাবেক মার্কিন গোয়েন্দা কর্মকর্তা ও আটলান্টিক কাউন্সিলের বিশ্লেষক জনাথন প্যানিকফ বলেন, নতুন হামলা বা আরও কঠোর সামরিক পদক্ষেপ ইরানের অবস্থান পরিবর্তন করবে—এমন বিশ্বাস করার যথেষ্ট কারণ নেই। বরং এতে তেহরান আরও কঠোর অবস্থান নিতে পারে।
অন্যদিকে ট্রাম্প প্রশাসনের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা রয়টার্সকে বলেন, প্রেসিডেন্টের অগ্রাধিকার কূটনৈতিক সমাধান হলেও ইরান কেবল সামরিক শক্তির ভাষাই বোঝে। তাই নৌপথে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হলে যুক্তরাষ্ট্র প্রয়োজনীয় জবাব দিতে থাকবে।
এদিকে অন্তর্বর্তী সমঝোতা ভেঙে যাওয়ায় ট্রাম্প নিজ দেশেও রাজনৈতিক চাপের মুখে রয়েছেন। দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত, সম্ভাব্য প্রাণহানি, অর্থনৈতিক চাপ এবং আসন্ন মধ্যবর্তী নির্বাচন তার জনপ্রিয়তার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করছেন পর্যবেক্ষকরা।
ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে স্থায়ী সমঝোতার আলোচনা এখনো স্থবির রয়েছে। এদিকে ট্রাম্প সম্প্রতি দাবি করেছেন, ইরানে আটক এক মার্কিন নাগরিক মুক্তি পেয়েছেন। তবে ইরানের বিচার বিভাগ সেই দাবি অস্বীকার করেছে।
হোয়াইট হাউস অভিযোগ করেছে, সাম্প্রতিক নৌপথে উত্তেজনা ও ইরানি জাহাজ-সংক্রান্ত ঘটনাগুলো অন্তর্বর্তী চুক্তির লঙ্ঘন। এর জবাবে ওয়াশিংটন ইরানের ওপর নতুন অর্থনৈতিক চাপ প্রয়োগের অংশ হিসেবে বন্দর অবরোধ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে ইরানি তেল বিক্রির ক্ষেত্রে দেওয়া ছাড় প্রত্যাহার করেছে।
রয়টার্সের তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার লক্ষ্য ভবিষ্যতে আরও বড় সামরিক অভিযানের আগে ইরানের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সক্ষমতা দুর্বল করা।
অন্যদিকে ইরানও হুঁশিয়ারি দিয়েছে, হামলা আরও বাড়ানো হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র দেশগুলোর বেসামরিক স্থাপনাও লক্ষ্যবস্তু হতে পারে। দেশটির হাতে এখনো উল্লেখযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন সক্ষমতা রয়েছে।
এ ছাড়া একাধিক সূত্রের বরাতে রয়টার্স জানিয়েছে, তেহরান ইয়েমেনের হুথি গোষ্ঠীকে বাব আল-মান্দেব প্রণালি বন্ধের প্রস্তুতি নিতে বলেছে। এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ নতুন সংকটে পড়তে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, দ্বিতীয় মেয়াদে বিদেশে সামরিক হস্তক্ষেপ কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় এলেও ট্রাম্প আবারও সংঘাতের পথ বেছে নেওয়ার ঝুঁকি নিচ্ছেন। ইসরায়েলের ইনস্টিটিউট ফর ন্যাশনাল সিকিউরিটি স্টাডিজের গবেষক ড্যানি সিত্রিনোভিচের ভাষ্য, যতই সামরিক চাপ বাড়ানো হোক না কেন, ইরানের নেতৃত্ব সহজে নতি স্বীকার করবে না; বরং সংঘাত আরও বিস্তৃত হওয়ার আশঙ্কাই বেশি।