নিজস্ব প্রতিবেদক
পবিত্র হজ পালনকালে এম.এম.এ কাদের ও তাঁর দুই নাতি।
ছবি:
লক্ষ্মীপুর জেলার রায়পুর উপজেলার উত্তর কেরোয়া গ্রামের কৃতী সন্তান এম.এম.এ কাদের একজন সফল উদ্যোক্তা ও মানবহিতৈষী সমাজসেবক হিসেবে ব্যাপকভাবে পরিচিত। শিক্ষানুরাগী এই মানুষটি দীর্ঘদিন ধরে দেশের শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমাজকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন।
জন্ম ও শিক্ষাজীবন
১৯৬০ সালের ২৫ মার্চ সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন এম.এম.এ কাদের। তাঁর পিতা নাদের বখশ মোল্লা ছিলেন একজন স্বচ্ছল গৃহস্থ এবং মাতা শুকুরুন্নেসা ছিলেন একজন সুগৃহিণী। চার ভাই ও দুই বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন সর্বকনিষ্ঠ।
গ্রামীণ পরিবেশে বেড়ে ওঠা এম.এম.এ কাদের ১৯৭৮ সালে রায়পুর এল.এ. মডেল পাইলট হাইস্কুল থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে এসএসসি এবং ১৯৮০ সালে রায়পুর সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। পরবর্তীতে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসহ এম.কম ডিগ্রি অর্জন করেন।
ব্যবসায়িক জীবন ও বিদেশ ভ্রমণ
স্বাধীনচেতা মনোভাবের কারণে লেখাপড়া শেষ করার পর তিনি পারিবারিক ব্যবসায় আত্মনিয়োগ করেন এবং এ. কে. গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্ব পালন করেন। ব্যবসায়িক কারণে তিনি ভারত, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, সিঙ্গাপুর, ম্যাকাও, চীন, কোরিয়া, জাপান, সংযুক্ত আরব আমিরাত, কাতার, তুরস্ক, সুইজারল্যান্ড, ইংল্যান্ড, স্কটল্যান্ড, যুক্তরাষ্ট্র, ইতালি, জার্মানি ও কানাডাসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ভ্রমণ করেছেন। এ পর্যন্ত তিনি পাঁচবার পবিত্র হজব্রত পালন করেছেন।
পারিবারিক জীবন
সুখী দাম্পত্য জীবনে তাঁর সহধর্মিণী ইয়াসমিন আরা বেগম বাংলাদেশ স্টিল ট্রেড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানি এবং প্রি-ইঞ্জিনিয়ার্ড স্টিল স্ট্রাকচার্স লিমিটেডের চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের দুই পুত্র—আলহাজ এম.এম. ইকরামুল ইসলাম নাদিম ও আলহাজ এম.এম. মোস্তফা নবী ফাইয়াজ। বড় পুত্র নোভা অটো ব্রিকসের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ স্টিল ট্রেড অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানির পরিচালক, আর কনিষ্ঠ পুত্র উভয় প্রতিষ্ঠানের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন এবং বর্তমানে আইইউবিতে বিবিএ অধ্যয়নরত। বড় পুত্রের দুই সন্তান এম.এম. ওয়াজিউল ইকরাম জায়ান ও এম.এম. ওয়াজিউল গণি আদিয়ান।
সমাজসেবায় ব্যাপক অবদান
শিক্ষা, স্বাস্থ্য, ধর্মীয় ও মানবিক খাতে এম.এম.এ কাদেরের অবদান বিস্তৃত ও বহুমুখী।
উল্লেখযোগ্য কিছু কর্মকাণ্ড নিম্নরূপ—
শিক্ষাক্ষেত্রে অবদান
প্লে থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত এম.এম.এ. কাদের একাডেমি প্রতিষ্ঠা করেছেন।
রায়পুর মহিলা কলেজে দাতা সদস্য হিসেবে যুক্ত রয়েছেন।
বিভিন্ন এলাকায় নূরানি ও হাফেজিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করেছেন।
গরিব ও দুস্থ শিক্ষার্থীদের নিয়মিত আর্থিক অনুদান প্রদান করেন।
ভূমি ও অবকাঠামোগত দান
৬নং কেরোয়া ইউনিয়ন পরিষদ ও ৫নং চরপাতা ইউনিয়নের হাসপাতালের জন্য ভূমি দান করেছেন।
রায়পুর মহিলা কলেজের হাসপাতালের জন্যও ভূমি দিয়েছেন।
ভোলা জেলার লালমোহন উপজেলার রায়পুর কান্তি গ্রামে দাদা ও পৈতৃক সম্পত্তিতে একটি সুদৃশ্য মসজিদ প্রতিষ্ঠা করেছেন।
গাজীপুরের শ্রীপুর উপজেলার তেলিহাটি ইউনিয়ন ও মাওনায় একাধিক মসজিদ, মাদ্রাসা ও এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেছেন।
ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে পৃষ্ঠপোষকতা
রায়পুর বুড়া হযরত (পীরবাড়ি)-এর অন্যতম পৃষ্ঠপোষক।
রায়পুরের বিভিন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অন্যতম দাতা সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
মানবিক ও দাতব্য কর্মকাণ্ড
এলাকায় বয়স্কভাতা প্রচলন করেছেন এবং কন্যাদায়গ্রস্ত পিতাদের আর্থিক সহায়তা দিয়ে থাকেন।
দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসার জন্য নিয়মিত আর্থিক সহায়তা করেন।
ভূমিহীন ও গৃহহীনদের বাসস্থানের ব্যবস্থা করে দেন।
দরিদ্র ও দুস্থ মেয়েদের বিবাহে আর্থিক অনুদান প্রদান করেন।
বেকারত্ব দূরীকরণে কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেন।
যশোরের চৌগাছা উপজেলার দীঘল সিঙ্গা গ্রামে নিকটাত্মীয়দের বাসস্থান, বিবাহ ও কর্মসংস্থানের সুব্যবস্থা করে দিয়েছেন।
নাটোর জেলার বড়াইগ্রাম উপজেলার ২নং চানমারি ইউনিয়নে ২০০৪ সালে নূরন্নবী চৌধুরী ট্রাস্ট এতিমখানা প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে আজও তিনি নিয়মিত আর্থিক অনুদান দিয়ে যাচ্ছেন।
বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলায় প্রাকৃতিক দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সহায়তা এবং শীতার্তদের মধ্যে শীতবস্ত্র বিতরণ করে থাকেন।
মঙ্গা এলাকায় অভাবী মানুষদের মাঝে শীতবস্ত্র বিতরণ করেছেন।
রোহিঙ্গাদের মধ্যেও ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করেছেন তিনি।
অসহায় মুক্তিযোদ্ধাদের সামগ্রী প্রদান এবং মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের পরবর্তী প্রজন্মের কর্মসংস্থানে ভূমিকা রেখেছেন।
মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করা এম.এম.এ কাদের ছায়ানীড়ের অন্যতম পৃষ্ঠপোষক।
বিভিন্ন সংগঠনের সদস্যপদ
তিনি ঢাকা চেম্বার অব কমার্স, লক্ষ্মীপুর জেলা সমিতি, গুলশান সাউথ ক্লাব, ঢাকা বোট ক্লাব, এলিট ক্লাব ও ধানমন্ডি ক্লাবের আজীবন সদস্য।
মাতৃভক্তির অনন্য দৃষ্টান্ত
সাক্ষাৎকারে এম.এম.এ কাদের বলেন, পিতা-মাতা, ভাই-বোন ও আত্মীয়-স্বজনের মধ্যে সুদৃঢ় সেতুবন্ধন গড়ে তোলাই তাঁর একান্ত প্রত্যাশা। তিনি স্বপ্ন দেখেন একটি ভিক্ষুকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ার।
তাঁর মাতৃভক্তির একটি হৃদয়স্পর্শী দৃষ্টান্ত তুলে ধরে তিনি জানান, মায়ের জীবদ্দশায় তিনি ঢাকা থেকে রায়পুরের গ্রামের বাড়িতে হেলিকপ্টারে যাতায়াত করতেন, এমনকি এ কারণে নিজ বাড়িতে হেলিপ্যাডও নির্মাণ করেছিলেন। কিন্তু ২০০৭ সালের ১৭ জানুয়ারি মায়ের মৃত্যুর পর, সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও তিনি আর কখনো স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে হেলিকপ্টারে বাড়ি যাতায়াত করেননি। এটিই তাঁর মাতৃভক্তির অনন্য ও মর্মস্পর্শী নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়ে থাকে।