মোঃ শিফাদ সিকদার, স্টাফ রিপোর্টার
দূষণ, জলবায়ু পরিবর্তন, প্রাকৃতিক সম্পদের অপচয় ও জীববৈচিত্র্য হ্রাসের ঝুঁকি বাড়ছে বিশ্বজুড়ে। এসব সংকট মোকাবিলা এবং টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশবিষয়ক দক্ষ জনবলের চাহিদাও বাড়ছে। শিক্ষা, গবেষণা, নীতিনির্ধারণ, শিল্প-কারখানা ও আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থাসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে পরিবেশবিজ্ঞানীদের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গ্রিন ইকোনমি বা সবুজ অর্থনীতি গড়ে তোলা এবং জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট (এসডিজি) বাস্তবায়নে পরিবেশবিজ্ঞান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। ফলে বাংলাদেশের তরুণদের জন্যও বিষয়টি সম্ভাবনাময় শিক্ষাক্ষেত্র হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরিবেশগত সংকট এখন শুধু প্রকৃতির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর প্রভাব পড়ছে মানুষের স্বাস্থ্য, জীবনযাত্রা, অর্থনীতি ও ভবিষ্যৎ নিরাপত্তায়। এ পরিস্থিতিতে পরিবেশবিজ্ঞানে পড়াশোনা করে পরিবেশ সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ ও প্রাকৃতিক সম্পদের টেকসই ব্যবস্থাপনায় অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে।
পরিবেশবিজ্ঞান একটি বহুমাত্রিক বিষয়। এতে জীববিজ্ঞান, অণুজীববিজ্ঞান, রসায়ন, পদার্থবিজ্ঞান, গণিত, পরিসংখ্যান ও প্রকৌশলের পাশাপাশি ভূগোল, জিআইএস, রিমোট সেন্সিং, মৃত্তিকাবিজ্ঞান, বনবিদ্যা, পানিসম্পদ ও বায়ুমণ্ডলবিজ্ঞান সম্পর্কে পড়ানো হয়। এ ছাড়া পরিবেশ অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, আইন ও শিল্পকারখানার দূষণ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কেও জ্ঞান অর্জনের সুযোগ রয়েছে।
এ বিষয়ে জলবায়ু পরিবর্তন, বায়ু-পানি-মাটিদূষণ, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ, প্রাকৃতিক সম্পদ ব্যবস্থাপনা, দুর্যোগ মোকাবিলা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং পরিবেশনীতি ও আইন নিয়ে পড়াশোনা ও গবেষণা করা যায়। তাত্ত্বিক জ্ঞানের পাশাপাশি ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জনের সুযোগ থাকায় বিজ্ঞানমনস্ক ও সমস্যা সমাধানে আগ্রহী শিক্ষার্থীদের জন্য বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রেও পরিবেশবিজ্ঞানের পরিধি বিস্তৃত। ইউরোপ, উত্তর আমেরিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশে এ বিষয়ে স্নাতকোত্তর, পিএইচডি ও গবেষণার সুযোগ রয়েছে। কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, জাপান, জার্মানি, দক্ষিণ কোরিয়া ও চীনের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিবেশবিজ্ঞান ও সংশ্লিষ্ট বিষয়ে উচ্চশিক্ষা নেওয়া যায়। যোগ্যতা, গবেষণার প্রস্তাব ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শর্ত অনুযায়ী শিক্ষার্থীরা বৃত্তির জন্যও আবেদন করতে পারেন।
কর্মক্ষেত্রেও রয়েছে বহুমুখী সম্ভাবনা। সরকারি প্রতিষ্ঠানে পরিবেশ অধিদপ্তর, বন বিভাগ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর, সিটি করপোরেশন ও বিভিন্ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানে সংশ্লিষ্ট পদে কাজের সুযোগ রয়েছে। তবে এসব পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নিয়োগবিধি ও শিক্ষাগত যোগ্যতা প্রযোজ্য হবে।
বেসরকারি খাতে শিল্পকারখানা, তৈরি পোশাকশিল্প, নির্মাণপ্রতিষ্ঠান, পরামর্শক সংস্থা ও রিয়েল এস্টেট খাতে পরিবেশ ব্যবস্থাপনা, দূষণ নিয়ন্ত্রণ, কর্মক্ষেত্রে স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তা, কমপ্লায়েন্স এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নসংক্রান্ত কাজে দক্ষ জনবলের প্রয়োজন হয়। পাশাপাশি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ, গবেষণা ও টেকসই উৎপাদনব্যবস্থা গড়ে তোলার ক্ষেত্রেও কাজের সুযোগ রয়েছে।
জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ও বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থায় জলবায়ু পরিবর্তন, দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস, পরিবেশ সংরক্ষণ ও টেকসই উন্নয়নবিষয়ক প্রকল্পে কাজের সুযোগ তৈরি হতে পারে। এসব ক্ষেত্রে প্রকল্প কর্মকর্তা, গবেষক, নীতিবিশ্লেষক ও পরামর্শক হিসেবে কাজ করতে পরিবেশবিজ্ঞানের পাশাপাশি প্রকল্প ব্যবস্থাপনা, তথ্য বিশ্লেষণ, যোগাযোগ ও গবেষণার দক্ষতাও গুরুত্বপূর্ণ।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা দেশগুলোর অন্যতম বাংলাদেশ। তাই দেশের পরিবেশ সংরক্ষণ, নগরদূষণ নিয়ন্ত্রণ, উপকূলীয় এলাকার সুরক্ষা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও জলবায়ু সহনশীল উন্নয়ন নিশ্চিত করতে দক্ষ পরিবেশ বিশেষজ্ঞদের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। একই সঙ্গে শিল্পপ্রতিষ্ঠানে পরিবেশগত মান বজায় রাখা এবং উন্নয়ন প্রকল্পে পরিবেশগত প্রভাব বিবেচনায় নেওয়ার প্রয়োজনীয়তাও বাড়ছে।
সংশ্লিষ্ট খাতে কাজের সুযোগ কাজে লাগাতে শিক্ষার্থীদের একাডেমিক জ্ঞানের পাশাপাশি গবেষণা, মাঠপর্যায়ের কাজ, জিআইএস ও রিমোট সেন্সিং, তথ্য বিশ্লেষণ এবং পরিবেশগত প্রভাব মূল্যায়নের মতো ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে হবে।
সব মিলিয়ে, গ্রিন ইকোনমির বিকাশ, এসডিজি বাস্তবায়ন ও জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় পরিবেশবিজ্ঞানের গুরুত্ব বাড়ছে। বহুমুখী কর্মক্ষেত্র, উচ্চশিক্ষার সুযোগ এবং বাস্তব সমস্যার সমাধানে অবদান রাখার সম্ভাবনা—সবকিছু মিলিয়ে বাংলাদেশের তরুণদের জন্য পরিবেশবিজ্ঞান হতে পারে একটি সম্ভাবনাময় শিক্ষাক্ষেত্র।