শিশুদের স্কুলব্যাগেও বিপদ, ভুল অভ্যাসে বাড়তে পারে ঘাড়-কাঁধের ব্যথা
নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রতিদিন অফিস, বাজার কিংবা স্কুলে যাওয়ার সময় কাঁধে ব্যাগ বহন করা অনেকেরই অভ্যাস। কিন্তু ব্যাগের ওজন বেশি হলে কিংবা দীর্ঘক্ষণ এক কাঁধে ঝুলিয়ে রাখলে শরীরের বিভিন্ন পেশিতে অপ্রয়োজনীয় চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে শিশুদের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গুরুত্বপূর্ণ। বই-খাতা, পানির বোতল, টিফিন বক্সসহ নানা জিনিসে ভারী হয়ে ওঠা স্কুলব্যাগ বহন করতে গিয়ে তাদের ঘাড়, কাঁধ ও পিঠে অস্বস্তি দেখা দিতে পারে।
শিশুরা প্রতিদিন স্কুলে যাওয়া-আসার সময় দীর্ঘক্ষণ ব্যাগ বহন করে। অনেক ক্ষেত্রে ব্যাগের ওজন শিশুর শরীরের তুলনায় বেশি হয়ে যায়। আবার কেউ কেউ ব্যাগ এক কাঁধে ঝুলিয়ে হাঁটে, কেউ ব্যাগের ফিতা বেশি ঢিলে রাখে। এসব অভ্যাসে শরীরের স্বাভাবিক ভঙ্গি বজায় রাখা কঠিন হতে পারে এবং পেশিতে চাপ বাড়তে পারে।
এক কাঁধে ব্যাগ নিলে কী হয়?
এক কাঁধে ব্যাগের ভার পড়লে শরীরকে ভারসাম্য রক্ষার জন্য ভঙ্গি বদলাতে হয়। ব্যাগের ভার সামলাতে কাঁধ উঁচু হয়ে যেতে পারে, শরীর একদিকে হেলে পড়তে পারে। দীর্ঘক্ষণ এমন অবস্থায় থাকলে ঘাড়, কাঁধ ও পিঠের পেশিতে ক্লান্তি, টান কিংবা ব্যথা দেখা দিতে পারে।
শিশুরা ভারী ব্যাগ বহনের সময় সামনে ঝুঁকে হাঁটতে পারে। এতে ঘাড় ও পিঠের পেশিতে অতিরিক্ত চাপ পড়তে পারে। তবে ভারী স্কুলব্যাগ বহন করলেই মেরুদণ্ডের স্থায়ী ক্ষতি হবে বা শিশুর উচ্চতা কমে যাবে—এমন সিদ্ধান্তের পক্ষে নিশ্চিত প্রমাণ নেই। ঝুঁকি নির্ভর করে ব্যাগের ওজন, বহনের সময়, শরীরের ভঙ্গি এবং শিশুর শারীরিক অবস্থার ওপর।
শিশুদের স্কুলব্যাগ কতটা ভারী হওয়া উচিত?
শিশুর শরীরের তুলনায় ব্যাগের ওজন কম রাখা জরুরি। সাধারণভাবে স্কুলব্যাগের ওজন শিশুর শরীরের ওজনের ১০–১৫ শতাংশের মধ্যে রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়। তবে এটি সবার জন্য নির্ভুল সীমা নয়; শিশুর বয়স, শারীরিক সক্ষমতা ও বহনের সময় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অভিভাবকদের উচিত প্রতিদিন ব্যাগে কী কী নেওয়া হচ্ছে, তা পরীক্ষা করা। প্রয়োজন নেই এমন বই, খাতা বা অতিরিক্ত জিনিস ব্যাগে না রাখাই ভালো। স্কুল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে ক্লাসে বই রাখার ব্যবস্থা, ডিজিটাল পাঠ্যসামগ্রী কিংবা প্রয়োজন অনুযায়ী বই বহনের সুযোগ তৈরি করা গেলে শিশুদের ওপর চাপ কমতে পারে।
স্কুলব্যাগ বহনে যে নিয়মগুলো মানবেন
দুই কাঁধে ফিতা ব্যবহার: শিশুদের ব্যাকপ্যাকের দুটি ফিতা দুই কাঁধেই পরাতে হবে। এক কাঁধে ব্যাগ ঝুলিয়ে রাখার অভ্যাস নিরুৎসাহিত করুন।
ফিতা ঠিকভাবে বাঁধুন: ব্যাগ যেন খুব নিচে ঝুলে না থাকে। ফিতা এমনভাবে সমন্বয় করতে হবে, যাতে ব্যাগটি পিঠের কাছাকাছি থাকে এবং চলাফেরায় অসুবিধা না হয়।
ভারী জিনিস পিঠের কাছে রাখুন: ব্যাগের ভারী বই ও খাতা পিঠের কাছাকাছি রাখলে ভার বহন তুলনামূলক সুবিধাজনক হতে পারে। ব্যাগের ভেতরের জিনিসগুলো গুছিয়ে রাখুন।
চাকা লাগানো ব্যাগের কথা ভাবুন: দীর্ঘ পথ হাঁটতে হয় বা বইয়ের ওজন বেশি হলে চাকা লাগানো ব্যাগ বিবেচনা করা যায়। তবে সিঁড়ি, ভাঙা রাস্তা কিংবা ভিড়ের মধ্যে এ ধরনের ব্যাগ টানা অসুবিধাজনক হতে পারে।
শিশুর অস্বস্তি খেয়াল করুন: ব্যাগ বহনের পর শিশু ঘাড়-কাঁধে ব্যথা, পিঠে টান, হাত ঝিনঝিন করা কিংবা ব্যাগ তুলতে অসুবিধার কথা বললে বিষয়টি গুরুত্ব দিন।
বড়দেরও বদলাতে হবে অভ্যাস
অফিসের ল্যাপটপ ব্যাগ কিংবা বাজারের ঝোলা বহনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের সতর্কতা প্রয়োজন। ব্যাগ হালকা রাখুন, এক কাঁধে ঝোলালে প্রয়োজনে দিক পরিবর্তন করুন এবং দীর্ঘক্ষণ বহন এড়িয়ে চলুন। ব্যাকপ্যাক ব্যবহার করলে দুটি ফিতাই কাজে লাগান। দীর্ঘক্ষণ বসে কাজ করলে মাঝেমধ্যে উঠে হাঁটাচলা করুন।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন?
ব্যাগ বহনের পর ব্যথা হলে প্রথমে ওজন কমানো এবং বহনের পদ্ধতি পরিবর্তন করা যেতে পারে। কিন্তু ব্যথা দীর্ঘস্থায়ী হলে, ক্রমশ বাড়লে, হাত অবশ হয়ে এলে বা দুর্বলতা দেখা দিলে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শিশুদের ক্ষেত্রে ব্যথার কারণে হাঁটা, খেলাধুলা কিংবা স্কুলের স্বাভাবিক কাজে সমস্যা হলে দ্রুত চিকিৎসকের সঙ্গে যোগাযোগ করা উচিত।
মনে রাখতে হবে, ব্যাগের ওজনই একমাত্র বিষয় নয়; কীভাবে, কতক্ষণ এবং কোন ভঙ্গিতে ব্যাগ বহন করা হচ্ছে, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে শিশুদের স্কুলব্যাগের ওজন নিয়ন্ত্রণে পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সচেতনতা প্রয়োজন। ছোট ছোট অভ্যাসের পরিবর্তনেই অপ্রয়োজনীয় শারীরিক চাপ কমানো সম্ভব।