এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির, বাগেরহাট
ভরা মৌসুমেও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের উপকূলজুড়ে দেখা দিয়েছে ইলিশের তীব্র সংকট। জেলেদের জালে মিলছে না কাঙ্ক্ষিত মাছ, গভীর সমুদ্রে যেতে পারছে না অধিকাংশ ট্রলার, আড়তে কমেছে সরবরাহ আর বাজারে বেড়েছে দাম। সুন্দরবনসংলগ্ন বাগেরহাটসহ উপকূলীয় অঞ্চলে এ পরিস্থিতি শুধু জেলেদের নয়, পুরো মৎস্য অর্থনীতির জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বঙ্গোপসাগরে একের পর এক লঘুচাপ, নিম্নচাপ ও বৈরী আবহাওয়ার কারণে দীর্ঘ সময় সাগর উত্তাল থাকায় মাছ ধরার ট্রলারগুলো গভীর সমুদ্রে যেতে পারছে না। এর সঙ্গে জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদী-মোহনায় অবৈধ বেহুন্দি জালের বিস্তার এবং গভীর সমুদ্রে মাছ ধরার সীমিত সক্ষমতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে।
একসময় সুন্দরবনসংলগ্ন পানগুছি ও বলেশ্বর নদ ছিল রুপালি ইলিশের অন্যতম প্রধান উৎস। আষাঢ়-শ্রাবণ এলেই মোরেলগঞ্জ ও শরণখোলার আড়তগুলো মুখর থাকত টাটকা ইলিশের বেচাকেনায়। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে।
স্বাদে-গন্ধে অনন্য পানগুছি-বলেশ্বরের ইলিশ
দক্ষিণাঞ্চলের পানগুছি-বলেশ্বর নদীর ইলিশ দীর্ঘদিন ধরেই স্বাদ, গন্ধ, তেলের পরিমাণ এবং আকারের জন্য বিশেষ সুনাম অর্জন করেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, এ নদীর ইলিশের পেটি তুলনামূলক চওড়া এবং তেলের পরিমাণ বেশি হওয়ায় এর স্বাদ অন্য অঞ্চলের ইলিশের তুলনায় আলাদা।
বাগেরহাট রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি এস. এম. সাইফুল ইসলাম কবির বলেন, “বাজারে ইলিশ খুবই কম আসে। যা পাওয়া যায়, তার দাম এত বেশি যে সাধারণ মানুষের পক্ষে কেনা কঠিন হয়ে পড়েছে। নিত্যপ্রয়োজনীয় খরচ সামলাতেই হিমশিম খেতে হচ্ছে। কয়েক হাজার টাকা দিয়ে ইলিশ কেনা এখন অনেক পরিবারের জন্য স্বপ্নের মতো।”
জেলেরা ফিরছেন খালি হাতে
মোরেলগঞ্জ উপজেলার পানগুছি নদীর জেলে খলিল জানান, কয়েক বছর আগেও বলেশ্বর নদে প্রচুর ইলিশ মিলত। এখন জাল ফেলেও অনেক সময় খালি হাতে ফিরতে হয়।
তিনি বলেন, “দু-একটি ছোট ইলিশ পাওয়া গেলেও বড় ইলিশ খুব কম ধরা পড়ে। নদীতে আগের মতো মাছ নেই।”
জেলে ও ট্রলার মালিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে দীর্ঘ সময় সাগর উত্তাল থাকায় অনেক ট্রলার মাঝপথ থেকেই ফিরে এসেছে। আবার কয়েকদিন সাগরে অবস্থান করেও কাঙ্ক্ষিত মাছ না পাওয়ায় জ্বালানি খরচ পর্যন্ত উঠছে না।
জলবায়ু পরিবর্তনে বদলে যাচ্ছে ইলিশের বিচরণ
মৎস্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সমুদ্রের পানির তাপমাত্রা বৃদ্ধি, লবণাক্ততার পরিবর্তন এবং উজান থেকে মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়ায় ইলিশের স্বাভাবিক অভিবাসন ব্যাহত হচ্ছে। ফলে আগের মতো বড় ঝাঁকে নদী-মোহনায় ইলিশ প্রবেশ করছে না।
তাদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ইতোমধ্যেই উপকূলীয় মৎস্যসম্পদের ওপর স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান।
অবৈধ জালে হুমকিতে প্রজনন
স্থানীয় জেলে, আড়তদার ও ট্রলার মালিকদের অভিযোগ, পশুর, বলেশ্বরসহ সুন্দরবনসংলগ্ন বিভিন্ন নদী-মোহনায় এখনও অবাধে বেহুন্দি জাল ও অন্যান্য নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার হচ্ছে। এসব জালে ছোট-বড় সব ধরনের মাছ আটকা পড়ায় ইলিশের স্বাভাবিক চলাচল ও প্রজনন ব্যাহত হচ্ছে।
তাদের অভিযোগ, প্রশাসনের অভিযান চললেও প্রভাবশালী চক্রের কারণে অনেক এলাকায় অবৈধ জাল পুরোপুরি নির্মূল করা সম্ভব হচ্ছে না।
ভারতীয় ট্রলারের অনুপ্রবেশের অভিযোগ
স্থানীয় জেলেদের অভিযোগ, বঙ্গোপসাগরের সীমান্তবর্তী এলাকায় ভারতীয় ট্রলারের অনুপ্রবেশও বাংলাদেশের মৎস্যসম্পদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। তাদের মতে, শুধু বাংলাদেশের জলসীমায় নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে ইলিশ সংরক্ষণ সম্ভব নয়; এ জন্য বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও অভিন্ন সংরক্ষণ কার্যক্রম প্রয়োজন।
আড়তে কম সরবরাহ, বাজারে চড়া দাম
সরবরাহ কমে যাওয়ায় বাজারে ইলিশের দাম বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। বর্তমানে এক কেজি ওজনের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ৩ হাজার থেকে সাড়ে ৩ হাজার টাকায়। ৮০০ গ্রামের একটি ইলিশের দাম ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত।
মাছ ব্যবসায়ীরা বলছেন, ভরা মৌসুমেও যেখানে প্রতিদিন বিপুল পরিমাণ ইলিশ আড়তে ওঠার কথা, সেখানে এখন সরবরাহ নেমে এসেছে কয়েক গুণ। চাহিদা ও সরবরাহের ভারসাম্যহীনতায় দামও বেড়ে গেছে।
যা বলছে মৎস্য ও বন বিভাগ
মোরেলগঞ্জ উপজেলা জ্যেষ্ঠ মৎস্য কর্মকর্তা রণজিৎ কুমার বলেন, “সাগর ও পানগুছি-বলেশ্বর নদে পর্যাপ্ত ইলিশ রয়েছে। ভাদ্র-আশ্বিনে মূল মৌসুম শুরু হলে সরবরাহ আরও বাড়বে। বর্তমানে মৌসুমের শুরুতে মাছ কম ধরা পড়ায় দাম বেশি রয়েছে।”
জেলা মৎস্য বিভাগ ও সুন্দরবন বিভাগের কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন, অবৈধ জাল, নদী-মোহনায় প্রতিবন্ধকতা এবং পরিবেশগত পরিবর্তন ইলিশ উৎপাদনের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠেছে।
তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদে মৎস্যসম্পদ রক্ষায় কার্যকর সংরক্ষণ ব্যবস্থা, অবৈধ জাল উচ্ছেদ, বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা এবং নিয়মিত নজরদারি জোরদার করা প্রয়োজন।
অন্যদিকে বন বিভাগের কর্মকর্তারা মনে করেন, কঠোর সংরক্ষণ নীতি বাস্তবায়নের পাশাপাশি হাজার হাজার জেলে পরিবারের জন্য বিকল্প কর্মসংস্থান ও সামাজিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।
ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ
বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তন, অবৈধ মৎস্য আহরণ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা এবং সীমিত নজরদারির কারণে ইলিশের প্রাকৃতিক আবাসস্থল ও প্রজনন ক্ষেত্র ক্রমেই হুমকির মুখে পড়ছে।
তাদের অভিমত, অবৈধ জাল নির্মূল, নদী-মোহনায় কঠোর নজরদারি, প্রতিবেশী দেশের সঙ্গে সমন্বিত ব্যবস্থাপনা, জলবায়ু অভিযোজন কর্মসূচি এবং জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা ছাড়া এ সংকটের স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
ভরা মৌসুমেও যখন জালে কাঙ্ক্ষিত ইলিশ উঠছে না, তখন সুন্দরবন উপকূলের হাজারো জেলে পরিবারের চোখে একটাই প্রশ্ন—কবে ফিরবে সমুদ্রে মাছ, আর কবে ফিরবে তাদের জীবিকার স্বস্তি?