নিজস্ব প্রতিবেদক
সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে নিষিদ্ধ ঘোষিত আওয়ামী লীগের একাধিক সাবেক নেতা ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের নামে অন্তত ৫৩টি ফ্ল্যাট, বাড়ি, ভিলা, হোটেল অ্যাপার্টমেন্ট ও অফিস স্পেস থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, এসব সম্পদ বুর্জ খলিফা, দুবাই মেরিনা (মারশা দুবাই), ওয়াদি আল সাফা, নাদ আল শিবা এবং কৃত্রিম দ্বীপ পাম জুমেরাসহ অভিজাত এলাকায় অবস্থিত। অভিযোগ রয়েছে, অর্থ পাচারের মাধ্যমে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হয়েছে।
অর্থ পাচারের অভিযোগ অনুসন্ধানে ২০২৩ সালের ৩ এপ্রিল দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। প্রথমে কমিটির নেতৃত্বে ছিলেন দুদকের উপপরিচালক রামপ্রসাদ মণ্ডল। পরে তাঁকে গোপালগঞ্জে বদলি করা হয়। তিনি জানান, দুবাইয়ে বাংলাদেশিদের সম্পদের তথ্য সংগ্রহে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয়েছে। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক সেন্টার ফর অ্যাডভান্সড ডিফেন্স স্টাডিজ (C4ADS) এবং অর্গানাইজড ক্রাইম অ্যান্ড করাপশন রিপোর্টিং প্রজেক্ট (OCCRP)-এর কাছ থেকেও তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা চলছে।
এর আগে ওসিসিআরপির এক অনুসন্ধানে দুবাইয়ে ৪৫৯ বাংলাদেশির সম্পত্তির তথ্য প্রকাশিত হয়। ওই ঘটনার পর হাইকোর্ট দুদক, বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিট (বিএফআইইউ), পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) অনুসন্ধানের নির্দেশ দেন।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামালের (লোটাস কামাল) মেয়ে নাফিসা কামালের শাশুড়ি বিলকিস ইকবালের নামে দুবাই মেরিনায় একটি ফ্ল্যাট রয়েছে। যদিও তিনি ২০১৭ সালে মারা যান।
সাবেক সংসদ সদস্য ও প্রিমিয়ার ব্যাংকের চেয়ারম্যান এইচ বি এম ইকবালের নামে বুর্জ খলিফায় দুটি ফ্ল্যাট, একটি কমার্শিয়াল স্পেস, একটি অফিস স্পেস এবং পাম জুমেরায় একটি বাড়ির তথ্য পাওয়া গেছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, এসব সম্পদ কেনার ক্ষেত্রে তিনি তিনটি পৃথক পাসপোর্ট ব্যবহার করেছেন। ২০২৪ সালের নভেম্বরে তাঁর ও পরিবারের সদস্যদের ব্যাংক হিসাব জব্দ করে বিএফআইইউ।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া-১ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ এ কে একরামুজ্জামানের নামে দুবাই মেরিনা ও পাম জুমেরায় দুটি ফ্ল্যাটের তথ্য মিলেছে। এর মধ্যে একটি সম্পত্তিতে তাঁর ছেলে কামরুজ্জামানের মালিকানাও রয়েছে।
অনুসন্ধানে সবচেয়ে বেশি সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের নামে। তাঁর নামে বুর্জ খলিফায় দুটি, নাদ আল শিবায় ২৭টি ফ্ল্যাট, পলো রেসিডেন্সে একটি বাড়ি, মেরিনা ভিসতা টাওয়ারে দুটি ফ্ল্যাট, সানরাইজ বে টাওয়ার-১-এ চারটি ফ্ল্যাট এবং পাম জুমেরার রয়্যাল বেতে একটি হোটেল অ্যাপার্টমেন্ট রয়েছে বলে জানা গেছে। তাঁর ভাই আনিসুজ্জামান চৌধুরীর নামেও পাম জুমেরায় একটি ফ্ল্যাটের তথ্য পাওয়া গেছে।
এ ছাড়া যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগ নেতা ইফজাল আহমেদ চৌধুরীর নামে বুর্জ খলিফায় একটি ফ্ল্যাট এবং জাকের পার্টির চেয়ারম্যান মোস্তফা আমির মোহাম্মদ ফয়সলের নামে একটি হোটেল অ্যাপার্টমেন্টের তথ্যও তদন্তে উঠে এসেছে।
সিআইডির ফাইন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিটের অতিরিক্ত ডিআইজি বাছির উদ্দিন বলেন, আন্তর্জাতিক একটি সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে হাইকোর্টের নির্দেশ অনুসারে তদন্ত চলছে। তিনি জানান, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী জাবেদের বিরুদ্ধে ইতোমধ্যে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা হয়েছে এবং অন্যদের বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত যাচাই করা হচ্ছে।
অনুসন্ধানে আরও কয়েকজনের নামে দুবাইয়ে সম্পত্তির তথ্য পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে রয়েছেন জুরানচন্দ্র ভৌমিক, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য অধ্যাপক ইফতেখার উদ্দিন চৌধুরী ও তাঁর মেয়ে শেহতাজ মোনাসি খান, তিতাস গ্যাসের সাবেক কর্মকর্তা সাব্বের আহমেদ চৌধুরীর স্ত্রী রুমানা রিশাত জামান এবং বাংলা একাডেমির সাবেক মহাপরিচালক অধ্যাপক আবুল কালাম মনজুর মোরশেদের মেয়ে মনজুলা মোরশেদ।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ওয়াহিদুজ্জামান বুলবুল বলেন, বৈধ আয়ের অর্থ দিয়ে বিদেশে সম্পদ কেনা আইনগতভাবে বৈধ। তবে পাচার হওয়া অর্থ ফেরত আনতে বাংলাদেশ ও সংশ্লিষ্ট দেশের মধ্যে কার্যকর আইনি সহযোগিতা প্রয়োজন।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, বাংলাদেশের পাচার হওয়া অর্থের অন্যতম গন্তব্য এখন দুবাই। তাঁর মতে, আমদানি-রপ্তানি চালানে জালিয়াতি, কাগুজে প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ঋণ ও বিনিয়োগ প্রতারণা এবং হুন্ডির মাধ্যমে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচার হচ্ছে। এসব অর্থ বিদেশের অর্থনীতিতে বিনিয়োগে পরিণত হওয়ায় তা ফেরত আনা অত্যন্ত জটিল ও দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া।