নিজস্ব প্রতিবেদক
সমুদ্রে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানে আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ বাড়াতে ডাটা প্যাকেজের মূল্য ব্যাপকভাবে কমিয়েছে পেট্রোবাংলা। অফশোর বিডিং রাউন্ড-২০২৬-এর ১০টি ডাটা সেলস প্যাকেজের মধ্যে চারটি বিনা মূল্যে উন্মুক্ত করা হয়েছে। বাকি ছয়টি প্যাকেজের দাম কমিয়ে আনা হয়েছে মাত্র ৫ হাজার ডলারে। জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, এ উদ্যোগ দরপত্রে প্রতিযোগিতা বাড়াতে সহায়ক হতে পারে।
সংশোধিত মূল্যতালিকা অনুযায়ী, এসএস-৪ ও এসএস-৯ ব্লকের ২ডি সিসমিক সার্ভের তথ্যের দাম ৫ লাখ ৮ হাজার ডলার থেকে কমিয়ে ৫ হাজার ডলার করা হয়েছে। ডিএসপি-৪ প্যাকেজের মূল্য ৩ লাখ ১৪ হাজার ৬০০ ডলার থেকে কমিয়ে ৫ হাজার ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। এতে এসএস-১১ ব্লকের ২০১৬-১৭ সালের ৩ হাজার ১৫০ লাইন কিলোমিটার ২ডি সিসমিক তথ্য রয়েছে।
একই ব্লকের ২০১৮ সালের ৩০৫ বর্গকিলোমিটার ৩ডি সিসমিক সার্ভের তথ্যের দাম ১ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ ডলার থেকে কমিয়ে ৫ হাজার ডলার করা হয়েছে। ডিএস-১০ ও ডিএস-১১ ব্লকের ২০১১-১২ সালের ২ডি সিসমিক তথ্যের মূল্য ২ লাখ ৬৮ হাজার ডলার থেকে কমিয়ে ৫ হাজার ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। ডিএস-১১ ও এসএস-৭ ব্লকের ৩ হাজার ৭৭ লাইন কিলোমিটার ২ডি তথ্যের দাম ৩ লাখ ৭ হাজার ৭০০ ডলার থেকে কমানো হয়েছে একই পরিমাণে।
অন্যদিকে, ১৯৭৪ সালের সিসমিক সার্ভের তথ্য, ১৯৬৯ থেকে ২০১৭ সালের মধ্যে খনন করা ১১টি অনুসন্ধান কূপের তথ্য এবং ওয়েলড্রিল (ইউকে) লিমিটেডের হাইড্রোকার্বন হ্যাবিট্যাট স্টাডির তথ্যসহ কয়েকটি প্যাকেজ বিনা মূল্যে দেওয়া হচ্ছে। কাঞ্চন-১এক্স কূপের তথ্যও বিনা মূল্যে উন্মুক্ত করা হয়েছে।
পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আব্দুল মান্নান বলেন, ডাটা প্যাকেজের দাম কমালে দরপত্রে প্রতিযোগিতা বাড়বে এবং বাংলাদেশ লাভবান হবে বলে তারা মনে করছেন।
বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আমজাদ হোসেন বলেন, দেশের প্রয়োজন গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন, নাকি ডাটার ব্যবসা—সেটি আগে চিহ্নিত করা প্রয়োজন ছিল। দীর্ঘদিন ডাটার দাম বেশি থাকায় কোম্পানিগুলো আগ্রহ দেখায়নি। মূল্য কমানোর উদ্যোগকে তিনি স্বাগত জানান।
খাতসংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে ডাটার অতিরিক্ত মূল্য আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণে বাধা সৃষ্টি করেছে। সংশ্লিষ্ট বিভাগের এক কর্মকর্তার ভূমিকা নিয়েও নানা অভিযোগ ও গুঞ্জন রয়েছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।
২০২৬ সালের অফশোর বিডিং রাউন্ডে গভীর সমুদ্রের ১৫টি এবং অগভীর সমুদ্রের ১১টি ব্লকের জন্য আন্তর্জাতিক দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। দরপত্র জমার সময়সীমা চার মাস বাড়িয়ে ২০২৭ সালের ৩১ মার্চ নির্ধারণ করা হয়েছে। পেট্রোবাংলা জানিয়েছে, টার্কিশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (টিপিএও), চায়না ন্যাশনাল অফশোর অয়েল করপোরেশন (সিএনওওসি)সহ তিনটি কোম্পানি ইতোমধ্যে দরপত্র কিনেছে।
এর আগে ২০২৪ সালের মার্চে আহ্বান করা দরপত্রে সাতটি বহুজাতিক কোম্পানি অংশ নিতে আগ্রহ দেখিয়ে দরপত্র কিনলেও শেষ পর্যন্ত জমা দেয়নি। ফলে ওই বিডিং রাউন্ড বাতিল করা হয়। পরে গ্যাসের দাম বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন শর্তে ছাড় দিয়ে মডেল পিএসসি-২০২৬ চূড়ান্ত করা হয়।
২০১২ সালে মিয়ানমার এবং ২০১৪ সালে ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমা বিরোধ নিষ্পত্তির পর বাংলাদেশের সমুদ্রাঞ্চলে তেল-গ্যাস অনুসন্ধানের সম্ভাবনা তৈরি হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন অনুসন্ধান কার্যক্রমে স্থবিরতা থাকায় সেই সম্ভাবনা কাজে লাগানো যায়নি। এদিকে দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রের উৎপাদন কমে যাওয়ার বিপরীতে চাহিদা বাড়ছে। ফলে শিল্পায়নসহ বিভিন্ন খাতে গ্যাসসংকট তীব্র হচ্ছে।
মডেল পিএসসি-২০০৮ প্রণয়ন কমিটির প্রধান মকবুল ই-এলাহী চৌধুরী বলেন, কিছু প্যাকেজের দাম মিলিয়ন ডলারের কাছাকাছি ছিল, অথচ অন্য দেশে এ ধরনের তথ্য বিনা মূল্যে দেওয়া হয়। ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশে এসব তথ্য উন্মুক্ত থাকায় তখন বেশি কোম্পানি অংশ নিয়েছিল। এত বেশি দাম নির্ধারণের কারণ নিয়েও তিনি বিস্ময় প্রকাশ করেন।