প্রশাসনিক স্থবিরতা
নিজস্ব প্রতিবেদক
ইনসেটে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান।
ছবি:
নর্দার্ন ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি পিএলসির (নেসকো) ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান দায়িত্ব নেওয়ার চার মাসে রাজশাহীর প্রধান কার্যালয়ে মাত্র চার দিন উপস্থিত ছিলেন বলে অভিযোগ উঠেছে। নিয়মিত কর্মস্থলে উপস্থিত না থাকায় প্রতিষ্ঠানটির প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্থবিরতা এবং গ্রাহকসেবায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
নেসকোর কর্মকর্তা নজরুল ইসলাম জানান, রাজশাহীতে প্রধান কার্যালয় হলেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়মিত সেখানে উপস্থিত না থেকে ঢাকার বিজয়নগরে অবস্থিত লিয়াজোঁ অফিস থেকে দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনা করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২২ ডিসেম্বর দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে রাজশাহীর প্রধান কার্যালয়ে তাঁর উপস্থিতি ছিল মাত্র চার দিন। এতে মাঠপর্যায়ে সিদ্ধান্ত গ্রহণে বিলম্ব, জরুরি রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে ধীরগতি, বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা সমাধানে দীর্ঘসূত্রতা এবং ফাইল নিষ্পত্তিতে জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে সমন্বয়হীনতার পাশাপাশি গ্রাহকসেবা নিয়েও অসন্তোষ তৈরি হয়েছে বলে দাবি সূত্রগুলোর।
অথচ গত ১৫ এপ্রিল বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের প্রেক্ষাপটে সব বিদ্যুৎ কোম্পানির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নিজ নিজ কর্মস্থলে অবস্থান করে দায়িত্ব পালনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
ঢাকায় অফিস পরিচালনায় মাসে ব্যয় ১২ লাখ টাকা
নেসকোর ঢাকার লিয়াজোঁ অফিস পরিচালনায় প্রতি মাসে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ সরকারি অর্থ ব্যয় হচ্ছে বলে জানা গেছে। অফিস ভাড়া বাবদ প্রায় দুই লাখ টাকা ছাড়াও ১০ জন কর্মচারীর বেতন, আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োজিত চালকের বেতন এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক ব্যয় মিলিয়ে মাসিক খরচ দাঁড়াচ্ছে প্রায় ১২ লাখ টাকা।
সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, প্রতিষ্ঠানের প্রধান কার্যালয় রাজশাহীতে থাকা সত্ত্বেও ঢাকাকেন্দ্রিক দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনায় এত অর্থ ব্যয়ের প্রয়োজন কতটুকু।
এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালকের ব্যক্তিগত ব্যবহারের জন্য বিলাসবহুল গাড়ি ব্যবহার এবং আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে চালক নিয়োগের অভিযোগ রয়েছে। ঢাকায় জাতীয় প্রেস ক্লাবের কাছাকাছি এলাকায় দুটি ফ্ল্যাট রেস্ট হাউস হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। এ জন্য মাসে আরও প্রায় দুই লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি।
সভার ভাতা ও সম্মানী নিয়েও প্রশ্ন
ঢাকায় অনুষ্ঠিত দাপ্তরিক সভা-সমাবেশে বাড়তি ব্যয়ের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রতিটি সভায় অংশ নেওয়া কর্মকর্তা-কর্মচারীরা চার থেকে পাঁচ হাজার টাকা করে ভাতা পান। মাসে গড়ে ১৫ থেকে ২০টি সভা অনুষ্ঠিত হওয়ায় এ খাতে উল্লেখযোগ্য অর্থ ব্যয় হচ্ছে।
এ ছাড়া ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিজেও প্রতিটি সভায় প্রায় ১২ হাজার টাকা সম্মানী গ্রহণ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব ব্যয়ের অনুমোদন, প্রকৃত পরিমাণ ও বিধিবিধান অনুসরণের বিষয়টি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় প্রভাবের আশঙ্কা
রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থাপনায় নেসকোর ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, দায়িত্বশীল পদে থেকেও ব্যবস্থাপনা পরিচালক নিয়মিত প্রধান কার্যালয়ে উপস্থিত না থাকায় মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম তদারকি ও জরুরি সিদ্ধান্ত গ্রহণ ব্যাহত হচ্ছে। এর প্রভাব বিদ্যুৎ সরবরাহের সমস্যা সমাধান এবং লোডশেডিং পরিস্থিতি মোকাবিলায় পড়তে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করেছেন তাঁরা।
নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে যোগদানের আগে মো. মশিউর রহমান অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে নর্থওয়েস্ট পাওয়ার জেনারেশন কোম্পানির রূপসা ৮০০ মেগাওয়াট কম্বাইন্ড সাইকেল বিদ্যুৎ প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ওই সময়ের নিয়োগপ্রক্রিয়া নিয়েও আলোচনা ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
অভিযোগ অস্বীকার এমডির
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে নেসকোর ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. মশিউর রহমান বলেন, ‘চার মাস হলো আমি নেসকোতে যোগদান করেছি। দাপ্তরিক কাজের কারণেই বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছি। প্রয়োজন হলে ঢাকায় থেকেই দায়িত্ব পালন করতে হয়।’
চার মাসে মাত্র চার দিন রাজশাহীতে অফিস করার বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘নির্ধারিত দিনেও জরুরি সভার কারণে যাওয়া সম্ভব হয়নি।’
অভিযোগগুলো অস্বীকার করে মশিউর রহমান বলেন, কিছু সুবিধাভোগী স্বার্থান্বেষী মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এসব প্রচার করছে। নেসকোর প্রধান কার্যালয়ের অধীন ১৬টি জেলার কার্যক্রম তিনি পর্যবেক্ষণ করছেন বলেও জানান। নিজের দীর্ঘ চাকরিজীবনের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘৩৫ বছরের চাকরিজীবনে আমি কোনো অনিয়ম করিনি।’
এদিকে বিদ্যুৎ বিভাগের সচিব ফারজানা মমতাজ এবং বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব শাহিদুল ইসলামের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁরা ফোন রিসিভ না করায় বক্তব্য পাওয়া যায়নি।