ক্রীড়া প্রতিবেদক
গোলের জন্য শট কেবল একটি, আক্রমণভাগের তিন তারকা মিলে প্রতিপক্ষের বক্সে বল স্পর্শ করেছেন স্রেফ একবার—প্রথমার্ধে ফ্রান্সের ফুটবল ছিল এতটাই বিবর্ণ ও হতাশাজনক! তবে বিরতির পর সেই হতাশা ঝেড়ে ফেলে এক ভিন্ন ও দুর্দান্ত ফ্রান্সের দেখা মিলল। আর অধিনায়কোচিত পারফরম্যান্সে দলকে সামনে থেকে পথ দেখালেন কিলিয়ান এমবাপে। সেনেগালকে হারিয়ে ২০২৬ বিশ্বকাপে শুভসূচনা করল দিদিয়ে দেশমের দল।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে গত মঙ্গলবার রাতে অনুষ্ঠিত ‘আই’ গ্রুপের হাইভোল্টেজ ম্যাচটি ৩-১ গোলে জিতেছে দুইবারের সাবেক বিশ্ব চ্যাম্পিয়নরা। কিলিয়ান এমবাপে দলকে এগিয়ে নেওয়ার পর ব্যবধান বাড়ান বদলি নামা ব্র্যাডলি বার্কোলা। শেষ দিকে সেনেগাল একটি গোল শোধ করলেও, পরের মিনিটেই চোখধাঁধানো এক গোল করে নিজের জোড়া ও দলের জয় নিশ্চিত করেন এমবাপে।
জিঁরু-কে টপকে ফরাসি ইতিহাসে শীর্ষে এমবাপে
বিশ্বকাপ শুরুর আগে জাতীয় দলের হয়ে টানা তিন ম্যাচে গোল পাননি এমবাপে। আসর শুরুর আগে কোচকে বলেছিলেন, সব গোল তিনি বিশ্বকাপের জন্যই জমিয়ে রাখছেন। বিশ্বমঞ্চে নামতেই সেই কথার প্রমাণ দিলেন রিয়াল মাদ্রিদ ফরোয়ার্ড। এই ম্যাচে জোড়া গোল করার মাধ্যমে একটি অনন্য কীর্তি গড়েছেন তিনি। অলিভিয়ে জিঁরুকে (৫৭ গোল) ছাড়িয়ে এখন এককভাবে ফ্রান্সের ইতিহাসের সর্বোচ্চ গোলস্কোরার (৫৮ গোল) এখন কিলিয়ান এমবাপে।
এছাড়া চার বছর আগে কাতার বিশ্বকাপ ফাইনালের হ্যাটট্রিকের পর এবার প্রথম ম্যাচেই জোড়া গোল করলেন তিনি। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপে এমবাপের মোট গোল হলো ১৪টি। বিশ্বরেকর্ড স্পর্শ করতে তাঁর প্রয়োজন আর মাত্র দুটি গোল।
দুই অর্ধে দুই রকম ফ্রান্স
ম্যাচটিতে ফ্রান্সের পারফরম্যান্স ছিল পুরোই বিপরীতমুখী। ১৯৬৬ সালের পর বিশ্বকাপের গ্রুপ পর্বে প্রথমার্ধে ফ্রান্সের মাত্র ১টি শট নেওয়ার নজির ছিল না, যা এবার ঘটল। তবে দ্বিতীয়ার্ধে খোলস ছেড়ে বেরিয়ে তারা গোলমুখে ১০টি শট নিয়ে ৮টিই লক্ষ্যে রাখে।
ম্যাচের শুরু থেকে বল দখলে ফ্রান্স এগিয়ে থাকলেও প্রথম ২৫ মিনিটে নিশ্চিত সুযোগ তৈরি করে সেনেগাল। কাউন্টার অ্যাটাক থেকে চেলসি তারকা নিকোলাস জ্যাকসনের শট পোস্টে লেগে ফিরে আসলে বেঁচে যায় ফ্রান্স। প্রথমার্ধের যোগ করা সময়ে আরও একটি সহজ সুযোগ মিস করেন সেনেগালের ইসমাইলা সার।
পেনাল্টি বিতর্ক ও এমবাপে শো
দ্বিতীয়ার্ধের ৫৪ ও ৫৮ মিনিটে মাইকেল ওলিস ও এমবাপের দুটি নিশ্চিত শট রুখে দেন সেনেগালের অভিজ্ঞ গোলরক্ষক এদুয়াঁ মঁদি। এর পরপরই বক্সে সাদিও মানের চ্যালেঞ্জে এমবাপে পড়ে গেলে পেনাল্টির আবেদন করে ফ্রান্স, তবে ভিএআর (VAR) দেখে রেফারি তা নাকচ করে দিলে কিছুটা বিতর্ক তৈরি হয়।
তবে ফরাসিদের বেশিক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়নি। ৬৬তম মিনিটে ওলিসের পাস থেকে নিখুঁত শটে ডেডলক ভাঙেন এমবাপে (১-০)। ম্যাচের ৮০তম মিনিটে উসমান দেম্বেলের বদলি হিসেবে মাঠে নামেন ব্র্যাডলি বার্কোলা। মাঠে নামার ঠিক দুই মিনিটের মাথায় (৮২ মিনিট) আদ্রিওঁ রাবিওর পাস ধরে মঁদির মাথার ওপর দিয়ে চমৎকার চিপ শটে ব্যবধান দ্বিগুণ করেন এই তরুণ (২-০)।
৮ মিনিট যোগ করা সময়ের পঞ্চম মিনিটে ইব্রাহিম এমবায়ের শটে এক গোল শোধ করে ম্যাচে নাটকীয়তার আভাস দিয়েছিল সেনেগাল। কিন্তু আফ্রিকান দলটির সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি এক মিনিটও। পরের মিনিটেই মাঝমাঠের কাছাকাছি প্রায় ৩৫ গজ দূর থেকে এক বুলেটগতির দূরপাল্লার শটে সেনেগালের জাল কাঁপান এমবাপে। এই জাদুকরী গোলের মাধ্যমেই সেনেগালের কামব্যাকের সব আশা শেষ করে পূর্ণ ৩ পয়েন্ট নিয়ে মাঠ ছাড়ে ব্লুজরা।
২০০২ এর প্রতিশোধ: ২০০২ বিশ্বকাপের উদ্বোধনী ম্যাচে ডিফেন্ডিং চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সকে ১-০ গোলে হারিয়ে ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল সেনেগাল। দীর্ঘ ২৪ বছর পর বিশ্বমঞ্চে সেই হারের মধুর প্রতিশোধ নিল দিদিয়ে দেশমের শিষ্যরা।