স্পোর্টস ডেস্ক
ফুটবল কখনো অপেক্ষা করে না। এক প্রজন্মের বিদায়ের পর আরেক প্রজন্ম এসে জায়গা দখল করে নেয়। একসময় পেলের উত্তরসূরি ছিলেন ম্যারাডোনা, এরপর জিদান, রোনালদো ও রোনালদিনহোদের যুগ। গত প্রায় দুই দশক ধরে বিশ্ব ফুটবলের সবচেয়ে বড় আলোচনার বিষয় ছিলেন মেসি ও রোনালদো। স্বাভাবিকভাবেই ধারণা ছিল, সময়ের নিয়মে সেই অধ্যায়ের সমাপ্তি ঘটবে।
নতুন যুগের প্রতিনিধিত্ব করতে সামনে এসেছেন কিলিয়ান এমবাপে ও আরলিং হালান্ড। একজন গতির ঝড় তোলেন, অন্যজন গোলের পর গোল করে রেকর্ড গড়েন। ইউরোপীয় ক্লাব ফুটবল থেকে আন্তর্জাতিক অঙ্গন—সবখানেই গত কয়েক বছর ধরে তাদের প্রভাব স্পষ্ট। অনেকের ধারণা ছিল, ২০২৬ বিশ্বকাপ হবে এই দুই তারকার যুগ প্রতিষ্ঠার মঞ্চ।
কিন্তু সেই গল্পে এখনও একটি নাম সবচেয়ে উজ্জ্বল—লিওনেল মেসি।
বিশ্বকাপের সাম্প্রতিক ম্যাচগুলোতে এমবাপে ও হালান্ড দুজনই নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিয়েছেন। গোল করেছেন, দলকে জিতিয়েছেন এবং আলোচনায় এসেছেন। তবে একই সময়ে ৩৯ বছর বয়সী মেসিও আবার প্রমাণ করেছেন কেন তিনি এখনও ফুটবলের সবচেয়ে আলোচিত নামগুলোর একটি।
এমবাপে ও হালান্ড এখন ক্যারিয়ারের সেরা সময়ে। তাদের গতি, শক্তি ও ফিটনেস শীর্ষ পর্যায়ে। অন্যদিকে মেসি এমন এক বয়সে খেলছেন, যে বয়সে অনেক কিংবদন্তিই অবসর নিয়েছেন বা আগের প্রভাব হারিয়েছেন। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে চিত্রটা ভিন্ন।
তিনি এখন আর আগের মতো পুরো মাঠজুড়ে দৌড়ান না। বরং অভিজ্ঞতা, দূরদর্শিতা এবং খেলার অসাধারণ বোধ দিয়ে ম্যাচের গতিপথ নিয়ন্ত্রণ করেন। কয়েক সেকেন্ডের একটি পাস, একটি ড্রিবল কিংবা একটি সিদ্ধান্ত দিয়েই তিনি ম্যাচের চেহারা বদলে দিতে পারেন।
এমবাপে প্রতিপক্ষকে হারান গতিতে, হালান্ড হারান গোল করার অসাধারণ দক্ষতায়। আর মেসি জিতে যান ফুটবল মেধা, সৃজনশীলতা এবং মুহূর্ত তৈরি করার অনন্য ক্ষমতায়।
তাই এমবাপে ও হালান্ডের জন্য সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ শুধু গোল করা বা ট্রফি জেতা নয়। তাদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো এমন এক খেলোয়াড়ের ছায়া থেকে বেরিয়ে আসা, যিনি এখনও আলোচনার কেন্দ্রে অবস্থান করছেন।
যখন এমবাপে কোনো শিরোপা জেতেন, তখন প্রশ্ন ওঠে—তিনি কি মেসির পর্যায়ে পৌঁছাতে পারবেন? যখন হালান্ড গোলের পর গোল করেন, তখন আলোচনা হয়—তিনি কি মেসির রেকর্ড স্পর্শ করতে পারবেন? অর্থাৎ নতুন প্রজন্মের সাফল্যও শেষ পর্যন্ত মাপা হচ্ছে একজন আর্জেন্টাইন কিংবদন্তির মানদণ্ডে।
ফুটবলের ইতিহাসে এমন ঘটনা খুব বেশি দেখা যায় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে নতুন প্রজন্ম পুরোনোদের সরিয়ে নিজেদের যুগ প্রতিষ্ঠা করে। কিন্তু মেসির ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে, নতুন যুগ শুরু হলেও তিনি এখনও আলোচনার কেন্দ্র থেকে সরে যাননি।
একসময় মেসিকেও ম্যারাডোনার সঙ্গে তুলনা করা হতো। বিশ্বকাপ জয়ের আগে সেই প্রশ্ন তার পুরো ক্যারিয়ারজুড়ে ছিল। আজ পরিস্থিতি বদলে গেছে। এখন নতুন প্রজন্মকে তুলনা করা হয় মেসির সঙ্গে। একজন ফুটবলারের জন্য এর চেয়ে বড় স্বীকৃতি আর কী হতে পারে?
২০২৬ বিশ্বকাপে এমবাপে ও হালান্ড নিজেদের যুগ প্রতিষ্ঠার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা নতুন ইতিহাস লিখছেন। তবে একই সঙ্গে আরেকটি গল্পও চলছে—একজন কিংবদন্তির গল্প, যিনি বয়সকে হার মানিয়ে এখনও বিশ্ব ফুটবলের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন।
ফুটবলের মঞ্চে প্রজন্ম বদলায়, তারকা বদলায়, সময় বদলায়। কিন্তু বিশ্বকাপের আলো জ্বলে উঠলে এখনও একটি নাম বারবার সামনে আসে—লিওনেল মেসি। আর সেটিই হয়তো এই সময়ের ফুটবলের সবচেয়ে অসাধারণ গল্প।