নিজস্ব প্রতিবেদক
শিক্ষার্থীদের কেন্দ্র করেই একটি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল কর্মকাণ্ড পরিচালিত হয়। তাই শিক্ষার্থীদের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়া এবং তাঁদের সমস্যা ও সংকটে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই একজন শিক্ষক প্রকৃত অর্থে ভালো শিক্ষক হয়ে উঠতে পারেন বলে মন্তব্য করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ও ইমিরেটাস অধ্যাপক ড. আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী।
তিনি বলেছেন, “যে শিক্ষক শিক্ষার্থীদের মঙ্গল দেখেন না, তিনি ভালো শিক্ষক হতে পারেন না।” শিক্ষার্থীদের বিপদে শিক্ষকদের পাশে দাঁড়াতে হবে, বন্ধুর মতো আচরণ করতে হবে এবং তাঁদের কাছ থেকেও শেখার মানসিকতা রাখতে হবে।
সোমবার (২৪ আগস্ট) বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় সম্মেলন ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্রে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা উন্নয়নে চার মাসব্যাপী বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের সমাপনী ও সনদ বিতরণ অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
শিক্ষকতা কেবল চাকরি নয়, বরং জীবনব্যাপী সাধনা উল্লেখ করে আনোয়ারউল্লাহ চৌধুরী বলেন, আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণের পাশাপাশি একজন শিক্ষককে সারা জীবন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করতে হয়। জ্ঞানের জগৎ সীমাহীন। তাই নিরবচ্ছিন্ন পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চার মাধ্যমে নিজেকে সমৃদ্ধ করতে হবে বলে তিনি মন্ত্রব্য করেন।
তিনি বলেন, উচ্চশিক্ষায় গুণগত পরিবর্তন আনতে দক্ষ ও জ্ঞানসম্পন্ন শিক্ষক প্রয়োজন। দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের বুনিয়াদি প্রশিক্ষণের প্রয়োজনীয়তার কথা বলা হলেও এত দিন এ ধরনের কাঠামোবদ্ধ প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা ছিল না। ইউজিসির হিট প্রকল্পের আওতায় এ উদ্যোগ নেওয়ায় তিনি ইউজিসি কর্তৃপক্ষকে অভিনন্দন জানান এবং এ ধরনের প্রশিক্ষণ নিয়মিতভাবে চালিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানান।
উচ্চশিক্ষায় ইংরেজি ভাষার গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, জ্ঞানভান্ডারের বড় অংশই ইংরেজি ভাষায় রচিত। নতুন জ্ঞান অর্জন ও তা অন্যদের মধ্যে ছড়িয়ে দিতে একজন শিক্ষককে বাংলা ভাষার পাশাপাশি আবশ্যিকভাবে ইংরেজি ভাষায় দক্ষতা অর্জন প্রয়োজন।
শিক্ষকদের মূল্যবোধের প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, শিক্ষককে উচ্চ চিন্তার অধিকারী হতে হবে, তবে জীবনাচরণ হতে হবে সহজ ও সংযত। শুধু পাঠদান করলেই আদর্শ শিক্ষক হওয়া যায় না; জ্ঞানচর্চার সঙ্গে শিক্ষার্থীদের প্রতি দায়িত্ববোধও থাকতে হবে।
ইউজিসি চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ইউজিসি সদস্য অধ্যাপক ড. মাছুমা হাবিব এবং বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনিসুর রহমান।
সভাপতির বক্তব্যে মামুন আহমেদ বলেন, একজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকের প্রতি শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়, সমাজ ও রাষ্ট্রের আলাদা প্রত্যাশা রয়েছে। শিক্ষার্থীরা শিক্ষকের কাছে যথাযথ পাঠদান, ন্যায্য মূল্যায়ন ও সম্মানজনক আচরণ প্রত্যাশা করে। অন্যদিকে সামাজিক পরিবেশে একজন শিক্ষক অনেকের নিকট অনকরণীয় ব্যক্তিত্ব হিসেবে গণ্য হয়ে থাকে। ফলে, প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি একজন শিক্ষককে সামাজিক পরিবেশে আচার-আচরণেও অত্যন্ত সংযত হতে হয়।
তিনি বলেন, প্রশিক্ষণের উদ্দেশ্য শুধু কিছু কৌশল শেখানো নয়; বরং শিক্ষকদের দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক যোগাযোগ ও প্রয়োজনীয় পেশাগত সক্ষমতা গড়ে তোলা। হিট প্রকল্পের আওতায় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রায় পাঁচ হাজার তরুণ ও জ্যেষ্ঠ শিক্ষক এবং উচ্চশিক্ষা ব্যবস্থাপককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। এ লক্ষ্যে বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ একাডেমি প্রতিষ্ঠার কার্যক্রমও চলমান রয়েছে। পরিকল্পনা অনুযায়ী, একজন শিক্ষক বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদানের পর বুনিয়াদি ও পেশাগত প্রশিক্ষণ নিয়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদানে যাবেন।
ইউজিসি চেয়ারম্যান আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় থেকে নবীন শিক্ষকরা এই প্রশিক্ষণে অংশ নিয়েছেন। দীর্ঘ চার মাসের আবাসিক প্রশিক্ষণ তাদের মধ্যে একটি বন্ধন তৈরি করেছে। প্রশিক্ষণের অনেক বিষয় হয়তো ব্যক্তিগত প্রচেষ্টায় অর্জন করা সম্ভব, কিন্তু শক্তিশালী নেটওয়ার্ক তৈরি করা তুলনামূলকভাবে কঠিন। বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের এই সম্মিলন তাদের মধ্যে কার্যকর নেটওয়ার্ক গড়ে তোলার সুযোগ সৃষ্টি করেছ, যা এ প্রশিক্ষণের অন্যতম বড় প্রাপ্তি বলে তিনি মন্তব্য করেন।
অনুষ্ঠানে হিট প্রকল্পের ইউনিভার্সিটি টিচার্স ট্রেনিং একাডেমির ডিন অধ্যাপক ড. লায়লা নূর ইসলাম, প্রকল্প পরিচালক অধ্যাপক ড. আসাদুজ্জামান এবং প্রশিক্ষণ কোর্সের পরিচালক অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জহির রায়হান বক্তব্য দেন। এ ছাড়া বাউবির উপ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক ড. সিরাজুল ইসলাম, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. রফিকুল ইসলামসহ ইউজিসি, বাউবি ও হিট প্রকল্পের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
উল্লেখ্য, চার মাসব্যাপী এ পেশাগত উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণে ৩৩টি পাবলিক ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫৮ জন প্রভাষক ও সহকারী অধ্যাপক অংশ নেন।