rupalibangla
rupalibangla rupalibangla rupalibangla rupalibangla rupalibangla
rupalibangla
Ad for sale 870 x 100 Position (1)
Position (1)

স্মৃতিই যেখানে শেষ আশ্রয়

অমি দেব, কুবি

প্রকাশ : বৃহস্পতিবার, ১১ সেপ্টেম্বর,২০২৫, ০২:২৪ পিএম
স্মৃতিই যেখানে শেষ আশ্রয়

'যেতে নাহি দিব হায়, তবু যেতে দিতে হয়, তবু চলে যায়। কবি গুরু রবীন্দ্রনাথের লেখা কবিতায় প্রকাশ পায় মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা গভীর ক্রন্দন যা মানুষ ভাষায় প্রকাশ করতে পারে না, ঠিক তেমনি শৈশব-স্কুল-কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের শেষ দিনটি যেন জীবনের এক আবেগঘন অধ্যায়। চার বছরের পরিচিত ক্যাম্পাস, বন্ধুবান্ধব, শিক্ষক, ক্লাসরুম, ক্যান্টিন, লাইব্রেরি-সবকিছু যেন এক অদৃশ্য বাঁধনে বেঁধে রাখে আমাদের। কিন্তু সময় থেমে থাকে না, একদিন সবাইকে বলতে হয় বিদায়। বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়ার ঠিক আগ মুহূর্তে মনে পড়ে প্রথম দিনের লজ্জা, ভয় আর উচ্ছ্বাসের কথা। তখনকার অচেনা মুখগুলো এখন খুব আপন। যে বন্ধুটি বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাসের প্রথম দিন পাশে বসেছিল, সে আজ জীবনের অন্যতম ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। ক্লাসের আড্ডা, গ্রুপ স্টাডি, সেমিস্টার পরীক্ষা, প্রেজেন্টেশন, কিংবা হঠাৎ ক্লাস বাদ দিয়ে ঘুরতে যাওয়া-সব স্মৃতিই হৃদয়ে প্রতিমুহূর্তে উদ্ভাসিত হতে থাকে। যখন শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে নতুন আসে, নতুনভাবে নতুন পদচারণায় মত্ত হয় সেদিনের রঙিন অনুভূতিগুলোর ঠিক উলটো অনুভূতি হলো বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ছেড়ে যাওয়ার সময়। যে চোখ আসে হাজারো স্বপ্ন নিয়ে, সেই চোখ যেন বিদায় নেয় আবেগঘন মুহূর্ত আর বুকভরা স্মৃতি নিয়ে। বিদায় শব্দটির মধ্যে মুহূর্তেই আমাদের সামনে ফুটে ওঠে হৃদয়ের শত শত ব্যাকুলতা আর মনের আকুল আকুতি-মিনতি। বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে ওঠে, যেমন করে ওঠে প্রিয়জন বিয়োগের বেলায়। যদিও সকল বিদায় চিরজীবনের জন্য বিদায় নয়। কিছু বিদায় আবার ক্ষণিকের। দুটোই কমবেশি দুঃখজনক। একঝাঁক নক্ষত্রের একদিন ধুমকেতুর মতো আবির্ভাব হয়েছিল তারা আজ চলে যাবে, চোখের অন্তরালে, ভাবনার অতলে, প্রিয় শহর থেকে অনেক দূরে। আবার কবে দেখা হবে, নেই সেই নিশ্চয়তা। প্রিয় ক্যাম্পাস ছেড়ে যাওয়ার আকুলতার কথা নিয়ে আমাদের আজকের আয়োজন। কথা বলে বিদায়বেলায় মনের অনুভূতি জানার চেষ্টা করছি সম্প্রতি কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ে (কুবি) পড়াশোনার সমাপ্তি ঘটানো কয়েকজন জন শিক্ষার্থীর সাথে। 'একটি অধ্যায়ের ইতি আরেকটি নতুন অধ্যায়ের উন্মোচন করে' বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে যাওয়ার অনুভূতি সাধারণত মিশ্র, যেখানে বিদায়ের কষ্ট, ক্যাম্পাস জীবনের স্মৃতিচারণ এবং নতুন জীবনের অনিশ্চয়তা ও আশা কাজ করে। এর মাধ্যমে একটি অধ্যায়ের ইতি টেনে আরেকটি নতুন অধ্যায়ের পথ উন্মোচন হয়। ২০১৯ সালের জানুয়ারি মাসের কনকনে এক শীতের সকালে আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবন শুরু হয়েছিল। সেই দিনের ক্লাস ও ক্লাসের বাহিরের বিভিন্ন ঘটনা এখনো কানে বেজে উঠে । তাঁড়া করে বেড়ায় ক্যাম্পাসের রং-বেরঙের অনেক স্মৃতি। চোখে ভেসে উঠে ক্লাসের ফাঁকে করিডরের ভাঙ্গা-গড়ার ইতিহাসগুলো। বিশ্ববিদ্যালয় আমার কাছে আবেগের জায়গা। এই ক্যাম্পাস আমাকে শুধু শিক্ষাই দেয়নি, দিয়েছে জীবন, সম্পর্ক, আর নিজের পরিচয় খুঁজে পাওয়ার সাহস। ২০১৯ সালে যখন ভর্তি হই, একবারের জন্যও বুঝতে পারিনি পড়ালেখা শেষ করে ক্যাম্পাসকে এভাবে অনুভব করব। মন চাইলেই বাসায় যেতে পারতাম না। তাই দিন গুনতাম কবে গ্র‍্যাজুয়েশন শেষ হবে। কিন্তু এভাবে চোখের পলকে পোস্ট গ্র‍্যাজুয়েশনও শেষ হয়ে যাবে বুঝতে পারিনি।"

মুসলিমা জাহান তন্বী, লোকপ্রশাসন বিভাগ, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ

'পড়েছি কম, ছুটেছি বেশি' মানুষ যে জায়গাটা নিজের মনে করে, যে জায়ড়াটাতে স্বস্তি ফিল করে কিংবা ছুটে বেড়ায় সে জায়গাটা ছেড়ে দেওয়া তার জন্য অনেক বেদনাদায়ক সাথে বিড়ম্বনারও। ৫০ একরের ছোট্ট ক্যাম্পাসটাও ছিলো আমার কাছে এমনই। প্রিয়, স্বস্তির, ছুটে বেড়ানোর জীবন। কুবির পুরো সময়টা আমার এত ভালো কাটছে যে তরতাজা উপন্যাস মনে হয় নিজের কাছে। হয় না কিছু উপন্যাস পড়া শেষ করেও আমরা সেটা নিয়ে ভাবতে থাকি! তার রেশ থেকে যায়। আমার ক্যাম্পাস লাইফে যত স্মৃতি সবগুলোরই রেশ লেগে আছে এখনও, থাকবেও। কুবিতে আমি দারুণ সিনিয়র পেয়েছিলাম, কিছু অনবদ্য বন্ধু, কিছু মন জয় করার মত জুনিয়র পেয়েছিলাম। যাদের জন্যই কুবির ওই পার্টটুকু কেটেছে অনেক বেশি রঙিন। আমার পুরো জীবনের কুবির ওই পার্টটুকুই হয়ত সেরা পার্ট। লাইফের অন্যকিছু হয়ত কখনো এটাকে বিট করতে পারবে না। আমার তো মনে হয় আমি বেঁচে ছিলাম মূলত ক্যাম্পাসেই। ক্লাস, হল, পুরো ক্যাম্পাস জুড়ে মেলানো স্মৃতি। বৃষ্টির দিনে কৃষ্ণচূড়া রাস্তায় ভেজা, কুবির হিমশীতল সকালে কাঁপতে কাঁপতে হাঁটতে বের হওয়া, গরমের সময় বিভিন্ন রকমের ফুলের মেলা বসা, রাত তিনটায় চা খেতে বের হওয়া, বার্থডেটে কেক নিয়ে পুরো হল দৌড়াদৌড়ি করা, হুটহাট গানের আসর বসানো, শহিদ মিনারে বসে বিকেলের বাতাস খাওয়া সবই ছিল কুবি অধ্যায়ে। এখনও ঠিকই এসব হয় শুধু দেখার জন্য আমি নেই। ব্যস্ত জীবনে হঠাৎ এগুলো মনে পড়লে সত্যি বলতে অনেক বেশি খারাপ লাগে। কিন্তু কি করার, জীবনে নতুন কিছুর জন্য অনেককিছুই আমাদের ছাড়তে হয়, তাই কুবিও ছাড়তে হয়েছে। কুবিকে অবশ্যই মিস করি অনেক। কারণ কুবিতে আমি পড়েছি কম, ছুটে বেড়িয়েছি বেশি! কুবিতে আমি পড়েছি কম, জীবন কাটিয়েছি বেশি।"

তরিকুল ইসলাম নিলয়, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ

'এই বিদায় নতুন শুরুর প্রথম পদক্ষেপ' ক্যাম্পাস জীবনের শেষ দিনটা এক অদ্ভুত অনুভূতির নাম—চোখে জল, মুখে হাসি। ছয় বছরের প্রতিটি দিন যেন একটা করে গল্প, আর আজ তার শেষ অধ্যায়। এই বিশ্ববিদ্যালয় শুধু শিক্ষা নয়, দিয়েছে আত্মবিশ্বাস, বন্ধুত্ব আর জীবনের মূল্যবান পাঠ। বন্ধুদের সাথে আড্ডা, ক্লাসের ব্যস্ততা, পরীক্ষা নিয়ে টেনশন, রাতভর গ্রুপ স্টাডি, অ্যাসাইনমেন্ট—সবকিছু এখন শুধুই স্মৃতি। শিক্ষকরা ছিলেন অভিভাবকের মতো, আর বন্ধুরা ছিল এই যাত্রার সবচেয়ে বড় আশ্রয়। আজ বিদায়ের দিনে হৃদয়টা ভারী, কিন্তু কৃতজ্ঞতায় ভরা। এখান থেকেই আমরা বের হবো নতুন স্বপ্ন গড়ার পথে। এই বিদায় একটা শেষ নয়—এটা নতুন শুরুর পথে প্রথম পদক্ষেপ। ক্যাম্পাস ছেড়ে যাচ্ছি, কিন্তু এই ভালোবাসার জায়গাটা সারা জীবন রয়ে যাবে হৃদয়ে।"

মোঃ সামিন বখশ সাদী, অর্থনীতি বিভাগ, ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষ

'জীবনচক্র এভাবে চলছে, এভাবেই চলবে' বিশ্ববিদ্যালয় জীবন সবসময়ই এক বিশেষ আবেগের জাগায়। ছয় বছরের বন্ধুত্ব, ক্লাস, আড্ডা, পরীক্ষা আর আন্দোলন সংগ্রামের দিনগুলো হঠাৎ করেই স্মৃতির পাতায় ভেসে ওঠে। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন দেখা হতো, তাদের বিদায়ের মুহূর্তে চোখ ভিজে আসে। ক্যাম্পাস লাইফ নিয়ে স্মৃতিচারণ করতে গেলে আসলে এই ছোট্ট পরিসরে বলে শেষ করা সম্ভব না। তারপরও কিছুটা না বললেই নয়। মাস্টার্সের ক্লাস শেষে আমাদের যেদিন র‍্যাগ ডে ছিলো সেদিন ব্যাচের সবার সামনে বক্তব্যের সুযোগ পেয়ে শেষবারের মতো বন্ধুত্বের স্মৃতিচারণ করে কিছু কথা বলেছিলাম সেগুলো আমার এখনো মনে পড়ে। একটি ডায়েরিতে আমার ব্যাপারে বন্ধুদের মন্তব্য সংগ্রহ করেছিলাম যেটি এখনো স্বযত্বে তোলা আছে আমার টেবিলে, মাঝেমধ্যে পড়ি আর নস্টালজিক হই। মাস্টার্সের সার্টিফিকেট যেদিন এডমিন বিল্ডিং থেকে উত্তোলন করে বের হয়ে মেইন গেটের দিকে এগোচ্ছিলাম আমার ভেতরে যে কি চলতেছিলো বোঝাতে পারবো না। মনে হচ্ছিলো একজীবন এখানে কাটিয়েছি, কত্ত মায়ার এই ক্যাম্পাস। আমার কত হাসি, ঠাট্টা, আড্ডা, গান, কবিতা, বিতর্কের মুক্তমঞ্চ ছিল সেই ক্যাম্পাসকে এভাবে বিদায় জানাচ্ছি! মনে হচ্ছিলো যেন এইতো মাত্র সেদিন ২০১৬-১৭ সেশনে ফাস্ট ইয়ারে ভর্তি হয়েছি। চোখের পলকেই যেন এতগুলো বছর পার ফেললাম। ওই দিনটিকে আমি ভুলতে পারবো না কখনো। সেদিনই ছিল কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে আমার ছাত্রত্বের লেনাদেনা চুকানোর সর্বশেষ দিন। এখনো বিভাগে কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ে মাঝেমধ্যে যাই স্যার ম্যামদের সাথে দেখা হয় তবে ক্যাম্পাসের রানিং ছাত্র হিসেবে যে ফিলটা পেতাম সেটা মিসিং, নিজেকে কেমন জানি অতিথি অতিথি মনে হয় যে কিনা একটু পরেই বিদায় নেবে। মাঝে মাঝে এখনো সেই ক্যাম্পাস জীবনের সময়গুলোর স্মৃতিচারণ করি আর ভাবি "কি সোনালি, সুন্দর, শান্তির দিনগুলোই না কাটিয়েছিলাম! পেশাগত কর্মব্যস্ততায় ধীরে ধীরে জীবনটা যেন আনন্দহীন যান্ত্রিকতায় মুড়িয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এর বিপরীতে ভাবি, এটাই তো জীবনচক্র। এভাবেই চলছে, এভাবেই চলবে।"

ইউটিউব চ্যানেল সাবস্ক্রাইব করুন

Ad for sale 270 x 200 Position (2)
Position (2)