কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রতিবেদন
স্টাফ রিপোর্টার
দেশের ব্যাংকিং খাতে আমানতের ধরনে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। অতি ধনী আমানতকারীদের বড় অঙ্কের আমানত কমে আসার পাশাপাশি ছোট ও মাঝারি আমানতকারীর সংখ্যা বাড়ছে। একই সময়ে খুচরা ঋণগ্রহীতাদের খেলাপি ঋণের হিসাবও উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রকাশিত ‘ব্যাংকিং সেক্টর আপডেট’ শীর্ষক সর্বশেষ প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে। গত ২৩ জুলাই প্রকাশিত প্রতিবেদনে ২০২৬ সালের মার্চ পর্যন্ত তথ্য বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, শ্রেণিকৃত খেলাপি ঋণের ব্যাংক হিসাবের সংখ্যা এক বছরে দ্বিগুণের বেশি বেড়ে ২০২৬ সালের মার্চ শেষে দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৮৩ হাজার। আগের বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল প্রায় অর্ধেক।
এর মধ্যে ১ কোটি টাকা পর্যন্ত খেলাপি ঋণ রয়েছে—এমন হিসাবের সংখ্যা বেড়ে হয়েছে ৪৫ লাখ ৪৩ হাজার, যা এক বছর আগে ছিল ২১ লাখ ৬৩ হাজার। অর্থাৎ, খেলাপি হিসাব বৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে ছোট ও মাঝারি ঋণগ্রহীতাদের কাছ থেকে।
খুচরা ঋণে অবনতির ইঙ্গিত
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, খুচরা পর্যায়ে ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা উল্লেখযোগ্যভাবে দুর্বল হয়েছে। জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, পারিবারিক ঋণের চাপ, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের (এসএমই) ব্যবসায় স্থবিরতা এবং কৃষি ও ক্ষুদ্র ব্যবসা খাতে আয় কমে যাওয়াকে এর সম্ভাব্য কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ আর্থিক ব্যবস্থায় তাৎক্ষণিক চাপ সৃষ্টি করলেও বিপুলসংখ্যক ছোট ঋণের খেলাপি হওয়া সামগ্রিক অর্থনীতির জন্যও সতর্কবার্তা বহন করে।
খেলাপি ঋণের হার বেড়ে ৩২.৭ শতাংশ
প্রতিবেদন অনুযায়ী, মোট বিতরণ করা ঋণের বিপরীতে খেলাপি ঋণের অনুপাত এক বছরে ২৪ দশমিক ৬ শতাংশ থেকে বেড়ে ৩২ দশমিক ৭ শতাংশে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক বলছে, বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ও ইসলামী ব্যাংকগুলো উচ্চ খেলাপি ঋণের চাপে রয়েছে, যা ব্যাংক পরিচালনায় সুশাসনের ঘাটতির ইঙ্গিত দেয়। বিপরীতে বিদেশি ব্যাংকগুলোতে কঠোর ঝুঁকি ব্যবস্থাপনার কারণে খেলাপি ঋণের হার তুলনামূলকভাবে অনেক কম।
কুটির শিল্প সবচেয়ে ঝুঁকিতে
প্রতিবেদনে শিল্পভিত্তিক বিশ্লেষণে দেখা গেছে, কুটির শিল্প খাত সবচেয়ে বেশি ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। এ খাতে খেলাপি ঋণের অনুপাত ৫২ দশমিক ৮ শতাংশ, যা অন্যান্য খাতের তুলনায় সর্বোচ্চ।
এ ছাড়া ২০২৫ সালের মার্চ থেকে ২০২৬ সালের মার্চের মধ্যে ব্যবসা, কৃষি ও শিল্প—সব প্রধান খাতেই খেলাপি ঋণের অনুপাত বেড়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিশেষজ্ঞের মত
ব্র্যাক ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক ও রিটেইল ব্যাংকিং প্রধান মো. মাহীয়ুল ইসলাম বলেন, ১ কোটি টাকা পর্যন্ত ঋণের ক্ষেত্রে খেলাপি বৃদ্ধির অন্যতম কারণ হতে পারে ঋণ প্রদানের সময় যথাযথ ঝুঁকি মূল্যায়নের ঘাটতি।
তিনি বলেন, এসব খেলাপি ঋণের একটি বড় অংশ ভোক্তা ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড ঋণ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ায় অনেক গ্রাহকের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা দুর্বল হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১৬ সালের পর প্রতিষ্ঠিত নতুন ব্যাংক এবং বিদেশি ব্যাংক ছাড়া অধিকাংশ রাষ্ট্রায়ত্ত, বেসরকারি ও ইসলামী ব্যাংকে গত এক বছরে খুচরা ঋণের পরিমাণ বেড়েছে। একই সঙ্গে এসব ব্যাংকে খেলাপি ঋণের ঝুঁকিও বৃদ্ধি পেয়েছে, যা ব্যাংকিং খাতের স্থিতিশীলতার জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখা হচ্ছে।