৩২ কোটি টাকার প্রকল্প ঘিরে কমিশন বাণিজ্য
নিজস্ব প্রতিবেদক
বরিশাল শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ইইডি) নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে ঘুষ, কমিশন বাণিজ্য, দরপত্রে অনিয়ম, বিল আটকে রাখা এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের প্রতিকার চেয়ে সংশ্লিষ্ট সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ২৪ জন ঠিকাদার। একই সঙ্গে তার অপসারণ ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবিতে মানববন্ধন করেছেন ভুক্তভোগীরা।
ঠিকাদারদের অভিযোগ, প্রকল্পের কাজ পাওয়া থেকে শুরু করে বিল উত্তোলন ও নিরাপত্তা জামানত ফেরত পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে অনিয়মের শিকার হতে হচ্ছে তাদের। প্রায় ৩২ কোটি টাকার কারিগরি স্কুল ও কলেজ (টিএসসি) স্থাপন প্রকল্প এবং বরিশাল নগরীর কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্প ঘিরেও দরপত্র ও কমিশন লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং সংশ্লিষ্ট নথির পূর্ণাঙ্গ পর্যালোচনা প্রয়োজন।
বিল ছাড়ে কমিশন দাবি
ঠিকাদারদের ভাষ্য, বিদ্যালয়ের ভবন নির্মাণ, সংস্কার ও সম্প্রসারণের কাজ শেষ করার পরও মাসের পর মাস বিলের জন্য দপ্তরে ঘুরতে হয়। কোনো ক্ষেত্রে আংশিক বিল দেওয়া হলেও বাকি অর্থ আটকে রাখা হয়। আবার কখনো নতুন করে কাগজপত্র চাওয়া কিংবা কাজের পরিমাপ নিয়ে আপত্তি তোলার কারণে ফাইলের কার্যক্রম স্থগিত থাকে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, ‘এখানে কাজ করতে হলে দুইটা জিনিস লাগে, ধৈর্য আর টাকা। টাকা না দিলে ধৈর্যের পরীক্ষা নেওয়া হয়।’
ঠিকাদারদের দাবি, প্রকল্পের আকার ও বিলের পরিমাণ অনুযায়ী কথিত কমিশনের অঙ্ক নির্ধারণ করা হয়। সরাসরি অর্থ না চেয়ে কখনো মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে যোগাযোগ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব লেনদেনের সুনির্দিষ্ট পরিমাণ, অর্থ গ্রহণকারী ব্যক্তি এবং সংশ্লিষ্ট নথি স্বাধীনভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
বিল আটকে থাকায় ব্যাংকঋণের সুদ, শ্রমিকের মজুরি ও নির্মাণসামগ্রীর বকেয়া পরিশোধে সমস্যায় পড়ছেন ঠিকাদাররা। তাদের অভিযোগ, এর ফলে নতুন প্রকল্প বাস্তবায়নের সক্ষমতাও কমে যাচ্ছে।চার ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ
নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে চারটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে কাজ নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ তুলেছেন ঠিকাদারদের একাংশ। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো বরিশালের মেসার্স মোমিন সিকদার, দিনাজপুরের মেসার্স মা এন্টারপ্রাইজ, চট্টগ্রামের ইউনুস অ্যান্ড ব্রাদার্স এবং খুলনার মেসার্স রাফিদ ট্রেডার্স।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব প্রতিষ্ঠানের নামে কাজ নেওয়ার পর অন্য ঠিকাদারদের কাছে সাবকন্ট্রাক্টে কাজ দেওয়া হয়। এতে মূল কাজের বরাদ্দ, বাস্তবায়ন ও আর্থিক লেনদেনের ওপর প্রভাব বজায় থাকে। সাবকন্ট্রাক্টে কাজ নেওয়া ঠিকাদারদের বিল, জামানত ও ভবিষ্যৎ কাজ পাওয়ার সুযোগও সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে বলে তাঁদের অভিযোগ।
তবে প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রকৃত মালিকানা, নির্বাহী প্রকৌশলীর সঙ্গে কোনো ব্যবসায়িক সম্পর্ক রয়েছে কি না এবং কাজ হস্তান্তরের প্রক্রিয়া বিধিসম্মত ছিল কি না, তা যাচাই করতে দরপত্র, চুক্তিপত্র ও আর্থিক লেনদেনের নথি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
নিরাপত্তা জামানত নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ঠিকাদাররা। তাঁদের অভিযোগ, কয়েকটি কাজের বিপরীতে জামানত হিসেবে ৫ শতাংশ অর্থ কর্তন করা হয়েছে, যদিও তাদের দাবি অনুযায়ী প্রযোজ্য বিধিতে ১০ শতাংশ কর্তনের কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট চুক্তি ও বিধিমালা পর্যালোচনা ছাড়া এ অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

কলেজিয়েট বিদ্যালয়ের ৪ কোটি ২৯ লাখ টাকার প্রকল্প
বরিশাল নগরীর ২০ নম্বর ওয়ার্ডে কলেজিয়েট মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণ প্রকল্প ঘিরেও দরপত্রে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রকল্পটির ব্যয় ধরা হয়েছিল ৪ কোটি ২৯ লাখ ৩৪ হাজার টাকা।
প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালের ১৯ জুন প্রথম দফায় দরপত্র আহ্বান করা হয়। সে সময় কোহিনূর এন্টারপ্রাইজ কাজটি পায়। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় পরে পুনরায় দরপত্র আহ্বান করা হয়।
ঠিকাদারদের দাবি, পরবর্তী দরপত্রে চারটি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয় এবং প্রত্যেকেই ১০ শতাংশ ছাড় দিয়ে দরপত্র জমা দেয়। এ পর্যায়ে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে কাজ পাইয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন বলে অভিযোগ উঠেছে। প্রতিষ্ঠানটি সাবেক কাউন্সিলর ও মহানগর যুবলীগ নেতা জিয়াউল হক বিপ্লবের ঘনিষ্ঠ বলে অভিযোগকারীদের দাবি। দরপত্র প্রক্রিয়া ১২০ দিনের মধ্যে শেষ করার কথা থাকলেও তা অনুসরণ করা হয়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
প্রায় ৩২কোটি টাকার টিএসসি প্রকল্পে কমিশনের অভিযোগ
বরিশালের বাবুগঞ্জ ও আগৈলঝাড়ায় কারিগরি স্কুল ও কলেজ স্থাপন প্রকল্প ঘিরে প্রায় ৩২ কোটি টাকার কাজ নিয়ে কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ তুলেছেন ঠিকাদাররা।
তাদের দাবি, বসুন্ধরা হাউজিং (প্রা.) লিমিটেডের লাইসেন্স ব্যবহার করে নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলাম প্রকল্পের কাজ নিয়ন্ত্রণ করেছেন। পরে ৭ শতাংশ কমিশনের বিনিময়ে অন্য ঠিকাদারদের কাছে কাজ হস্তান্তর করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
এ প্রকল্পে অর্থ লেনদেনের বিষয়ে আরও অভিযোগ করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ২৩ অক্টোবর সকাল সাড়ে ১১টার দিকে বরিশাল সার্কিট হাউসে ঠিকাদার প্রতিনিধিরা প্রকল্পের অগ্রিম কমিশন হিসেবে ৩৫ লাখ টাকা দপ্তরের কম্পিউটার অপারেটর রাশেদের কাছে জমা দেন।
ঠিকাদারদের দাবি, অর্থ গ্রহণের পর রাশেদকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। পরে তাকে খুঁজতে তার পরিবারের সদস্যদের বরিশালে আনা এবং তাদের ওপর চাপ প্রয়োগের অভিযোগও রয়েছে। তবে অর্থ হস্তান্তর, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকা ও পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহের বিষয়ে স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্য পাওয়া যায়নি। এ কারণে প্রকল্পের কার্যাদেশ, চুক্তিপত্র, অর্থ পরিশোধের নথি এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য যাচাই করা জরুরি।২৪ ঠিকাদারের অভিযোগে যেসব বিষয়
লিখিত অভিযোগে ২৪ জন ঠিকাদার নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার, ঘুষ, দুর্নীতি, ভুয়া বিল উত্তোলন, দরপত্রে অনিয়ম ও হয়রানির অভিযোগ তুলেছেন।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে, কমিশন না দিলে বিল অনুমোদন না করা, নিরাপত্তা জামানত ফেরত পেতে অতিরিক্ত অর্থ দাবি, মাঠপর্যায়ে কাজের অগ্রগতি না থাকলেও নথিতে অগ্রগতি দেখানো এবং নির্দিষ্ট ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে সুবিধা দেওয়া।
এ ছাড়া ঠিকাদারদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার ও হুমকি, কর্মদিবসে প্রকৌশলীদের অননুমোদিত অনুপস্থিতি এবং সরকারি বিশ্রামাগারের অনিয়মিত ব্যবহারের অভিযোগও রয়েছে।
ঠিকাদার ফারুক হোসেনকে ফোনে গালিগালাজ ও হুমকি দেওয়ার অভিযোগও তুলেছেন সংশ্লিষ্টরা। তাদের দাবি, ২০২৫ সালের ২৯ নভেম্বর এ ঘটনা ঘটে। পরদিন ৩০ নভেম্বর বরিশাল কোতোয়ালি মডেল থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়, যার নম্বর ২০৭৬ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
ঠিকাদারদের আরও অভিযোগ, দপ্তরের ভেতরে ছয় থেকে আটজন ঠিকাদারকে কেন্দ্র করে একটি প্রভাবশালী বলয় গড়ে উঠেছে। প্রকল্পের বরাদ্দ, কার্যাদেশ, বিল ছাড় ও জামানত ফেরতের ক্ষেত্রে এই বলয় বাড়তি সুবিধা পায়।
নির্মাণকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন
দরপত্র ও বিলসংক্রান্ত অভিযোগের পাশাপাশি কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভবন নির্মাণ ও সংস্কারকাজের মান নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, কোথাও ভবন অসমাপ্ত অবস্থায় পড়ে আছে, কোথাও নির্মাণসামগ্রীর মান নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। আবার কিছু ক্ষেত্রে নথিতে কাজ শেষ দেখানো হলেও বাস্তবে ভবনের বিভিন্ন অংশ অসম্পূর্ণ বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
একটি বিদ্যালয়ের শিক্ষক অভিযোগ করেন, ভবনের ছাদ থেকে পানি পড়ে এবং দেয়ালে ফাটল দেখা দিয়েছে। অথচ নথিতে কাজ সম্পন্ন হওয়ার কথা বলা হয়েছে। অভিভাবকদের আশঙ্কা, ঝুঁকিপূর্ণ ভবনে পাঠদান চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হতে পারে।
তবে কোন প্রতিষ্ঠানে কী ধরনের ত্রুটি রয়েছে, নির্মাণকাজের দায়িত্বে কোন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ছিল এবং প্রকৌশলগত পরীক্ষায় কী ফল পাওয়া গেছে, তা যাচাই করা প্রয়োজন। নির্মাণকাজের পরিমাপ, উপকরণের পরীক্ষার ফল ও পরিদর্শন প্রতিবেদন প্রকাশের দাবিও জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।
বহাল তবিয়তে আওয়ামী দোসর শহিদুল
জানা গেছে, শহিদুল ইসলাম ছাত্রজীবন থেকেই ছাত্রলীগের কর্মকাণ্ডের সাথে জড়িত। বাড়ি বাগেরহাট জেলার মোড়লগঞ্জ উপজেলার ঢেপুয়ারপাড় জামুয়া গ্রামে। তার পিতার নাম শেখ রুস্তুম আলী। ডুয়েটে থাকাকালীন সময়ে আবেদ আলী পিএসসি সনদ বানিজ্যে জড়িয়ে পড়েন। বাগেরহাটে শেখ পরিবারের সাথে ঘনিষ্টতার সুযোগে সরকারি চাকরি এবং পরবর্তীতে কর্মস্থলে প্রভাবশালী হয়ে সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন। এমনটাই দাবি করেছেন ঠিকাদাররা।

পিএসসির প্রশ্নফাঁস ও শহিদুলের সম্পদের পাহাড়
নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) প্রশ্নফাঁসসংক্রান্ত আলোচিত ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও তুলেছেন ঠিকাদাররা। তাদের দাবি, ডুয়েটে শিক্ষাজীবনের সময় তিনি পিএসসির সাবেক চেয়ারম্যানের গাড়িচালক সৈয়দ আবেদ আলীকে ঘিরে আলোচিত প্রশ্নফাঁস চক্রের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তার নিজের ও কয়েকজন বন্ধুর নিয়োগপ্রক্রিয়ায় অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।
এ ছাড়া শহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে বরিশাল ও ঢাকায় জমি, ফ্ল্যাট, গাড়িসহ বিপুল সম্পদ অর্জনের অভিযোগ রয়েছে। এসব সম্পদ বৈধ আয়ের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) মাধ্যমে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা। একইসাথে শহিদুল ইসলামের আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্টতা এবং অতীতে পটুয়াখালী ও ঝালকাঠিতে দায়িত্ব পালনকালে অনিয়মের অভিযোগও তুলেছেন ঠিকাদাররা।
নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুল ইসলামের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন।
শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের প্রধান প্রকৌশলী বলেছেন, দুর্নীতি-অনিয়ম কোনোভাবেই বরদাস্ত করা হবে না। তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।