সজীব রাজভর বিপিন, সিনিয়র রিপোর্টার
শুধু পরীক্ষায় ভালো ফলাফল বা সার্টিফিকেট অর্জন নয়, শিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আচরণগত পরিবর্তন ও মূল্যবোধের বিকাশ ঘটাতে হবে বলে মন্তব্য করেছেন ময়মনসিংহের জেলা প্রশাসক মো. সাইফুর রহমান।
বৃহস্পতিবার (১৭ সেপ্টেম্বর) ময়মনসিংহ শহরের অ্যাডভোকেট তারেক স্মৃতি অডিটোরিয়ামে জেলা প্রশাসন ও জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস আয়োজিত ‘প্রাথমিক শিক্ষার গুণগত মানোন্নয়নে শিক্ষণ ও প্রতিষ্ঠান ব্যবস্থাপনা’ শীর্ষক প্রধান শিক্ষকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
জেলা প্রশাসক বলেন, শিক্ষার হার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও শিক্ষকের সংখ্যা এবং কারিকুলাম ক্রমাগত বাড়ছে ও আধুনিকায়ন হচ্ছে। তবে এর সঙ্গে শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য অর্জিত হচ্ছে কি না, তা গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। শিক্ষার মান নির্ধারণে শুধু পরীক্ষার ফলাফল, জিপিএ বা বৃত্তি অর্জনকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা উচিত নয়। শিক্ষার্থীরা কী শিখছে, তাদের জ্ঞান, দক্ষতা, সৃজনশীলতা, মূল্যবোধ ও সামাজিক দায়িত্ববোধ কতটা বিকশিত হচ্ছে—এসব বিষয়ও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করতে হবে।
প্রধান শিক্ষকদের উদ্দেশে তিনি বলেন, তরুণ প্রজন্মকে দোষারোপ না করে তাদের প্রতি আমাদের দায়িত্ব ও ব্যর্থতার জায়গাগুলো চিহ্নিত করতে হবে। তরুণদের সম্মান করতে শেখাতে হলে প্রথমে তাদের সম্মান দেওয়ার পরিবেশ তৈরি করতে হবে। একজন প্রধান শিক্ষককে শুধু প্রশাসনিক দায়িত্বে সীমাবদ্ধ না থেকে নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করতে হবে। একই সঙ্গে শিক্ষার্থীদের জীবন পরিবর্তনের পাশাপাশি সহকর্মীদের পেশাগত উৎকর্ষ বৃদ্ধি এবং প্রতিষ্ঠানকে আদর্শ প্রতিষ্ঠানে পরিণত করার উদ্যোগ নিতে হবে।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে শিক্ষার্থীদের কাছে আরও আকর্ষণীয় করে তুলতে পাঠ্যক্রমের পাশাপাশি বিজ্ঞানচর্চা, বিতর্ক, শিল্প-সংস্কৃতি, চিত্রাঙ্কন, খেলাধুলা ও কুইজসহ বিভিন্ন সহশিক্ষা কার্যক্রম নিয়মিত আয়োজনের ওপর গুরুত্বারোপ করেন জেলা প্রশাসক। তিনি বলেন, এসব কার্যক্রমের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের সুযোগ তৈরি হবে। এর জন্য বড় ধরনের অর্থের চেয়ে উদ্যোগ, আন্তরিকতা ও দায়িত্ববোধ বেশি প্রয়োজন।
মনিটরিং প্রসঙ্গে তিনি বলেন, শুধু তথ্য সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির মধ্যে মনিটরিং সীমাবদ্ধ থাকলে তা কার্যকর হয় না। মনিটরিংয়ের মাধ্যমে নির্ধারিত লক্ষ্য ও বাস্তব অবস্থার পার্থক্য চিহ্নিত করে এর কারণ অনুসন্ধান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। প্রত্যেক শিক্ষার্থী কোথায় দুর্বল, কেন দুর্বল এবং কীভাবে সেই দুর্বলতা দূর করা যায়—তা ধারাবাহিকভাবে মূল্যায়ন করতে হবে।
‘ক্লিন সানডে’ কর্মসূচির প্রসঙ্গ তুলে ধরে জেলা প্রশাসক বলেন, শিক্ষার্থীদের দিয়ে পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনার উদ্দেশ্য শুধু বিদ্যালয় পরিষ্কার করা নয়; বরং ছোটবেলা থেকেই তাদের মধ্যে নাগরিক দায়িত্ববোধ ও পরিবেশের প্রতি দায়িত্বশীলতা তৈরি করা।
তিনি বলেন, ময়মনসিংহকে শিক্ষা নগরী হিসেবে যে পরিচিতি দেওয়া হয়, তা ধরে রাখতে শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা জরুরি। পাঠ্যপুস্তক ও পরীক্ষার ফলাফলের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বাস্তব জ্ঞান, সৃজনশীলতা ও নৈতিক মূল্যবোধের বিকাশে শিক্ষক, প্রধান শিক্ষক, অভিভাবক ও প্রশাসনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
ময়মনসিংহ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. শফিকুল ইসলামের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (শিক্ষা ও আইসিটি) লুৎফুন নাহার এবং ময়মনসিংহ প্রাইমারি টিচার্স ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (পিটিআই) সুপারিনটেনডেন্ট মোহাম্মদ শাহজাহান কবীর।
সভায় জেলার বিভিন্ন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকরা অংশ নেন। তারা প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়ন, বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা, শিক্ষণ পদ্ধতি এবং মাঠপর্যায়ের বিভিন্ন সমস্যা ও সম্ভাবনার বিষয়ে মতামত তুলে ধরেন।