মো. এনামুল হক
সবুজ প্রকৃতির অনাবিল সৌন্দর্য আর পর্যটনের অপার সম্ভাবনার পাহাড়ি জনপদ খাগড়াছড়িতে এবার নতুন অর্থনৈতিক সম্ভাবনা দেখাচ্ছে মসলা ও অভিজাত ফল জাতীয় ফসল ‘আলুবোখারা’। সমতলের সাথে পাল্লা দিয়ে পাহাড়ের মানুষের অক্লান্ত পরিশ্রম, কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের নতুন নতুন উদ্ভাবন পার্বত্য অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। তবে মাঠপর্যায়ে এমন কৃষি বিপ্লব ঘটলেও এই সংক্রান্ত কোনো তথ্যই নেই খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি উপ-পরিচালকের দপ্তরে।
জানা গেছে, জেলার মাটিরাঙ্গা সদর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরের দুর্গম রসুলপুর এলাকায় ২০১৯ সালে ১৩ একর পাহাড়ি জায়গায় একটি মিশ্র ফল বাগান গড়ে তোলেন নুর আলম নামে এক উদ্যোক্তা। তার এই বাগানটি যেন দেশি-বিদেশি ফলের এক জীবন্ত প্রদর্শনী। এই বাগানেই মূলত পরীক্ষামূলকভাবে চাষ শুরু হয় চেরি আলুবোখারার।
২০২২ সালে খাগড়াছড়ি কৃষি গবেষণা কেন্দ্র থেকে ১০টি চারা সংগ্রহ করে রোপণ করেন নুর আলম। রোপণের মাত্র দেড় বছরের মাথায় গাছগুলোতে ফলন আসতে শুরু করে। গত বছরের ধারাবাহিকতায় এবারও গাছগুলোতে বাম্পার ফলন হয়েছে।
উদ্যোক্তা নুর আলম জানান, আলুবোখারা ফলটি পাকার সময় চমৎকার রঙ পরিবর্তন করে। প্রথমে সবুজ, তারপর ধীরে ধীরে হলুদ ও লাল এবং পুরোপুরি পরিপক্ব হলে তা কালচে রঙ ধারণ করে। বর্তমানে বাজারে প্রতি কেজি চেরি আলুবোখারা ২০০ থেকে ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে।
বাগান মালিক নুর আলম বলেন, “পাহাড়ের মাটি ও আবহাওয়া যে এই ফল চাষের জন্য এতটা অনুকূল, তা দেখে আমি অত্যন্ত আনন্দিত। সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, কোনো ধরনের রাসায়নিক সার বা কীটনাশক ব্যবহার ছাড়াই গাছগুলোতে প্রচুর ফলন হয়েছে। সামান্য পরিচর্যা পেলে পাহাড়ি অঞ্চলে আলুবোখারার বাণিজ্যিক চাষের বিপুল সম্ভাবনা রয়েছে।”
বাংলাদেশে পোলাও, বিরিয়ানি, রোস্ট, সালাদ, জ্যাম, জেলি, আচার ও বোরহানিসহ বিভিন্ন অভিজাত খাবার তৈরিতে আলুবোখারা ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হয়। দেশে এর বড় চাহিদা থাকলেও তা মূলত আমদানি করতে হয়। দেশের আবহাওয়া বিবেচনায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট (BARI)-এর মসলা গবেষণা কেন্দ্র থেকে উদ্ভাবিত ‘বারি আলুবোখারা-১’ জাতটি ২০১৩-১৪ সালে অনুমোদন লাভ করে। এই জাতের গাছ মাঝারি আকারের (৫-৬ মিটার) হয়ে থাকে এবং বাণিজ্যিক চাষের জন্য অত্যন্ত উপযোগী।
নুর আলমের এই বাগানে কর্মসংস্থানের সুযোগ হয়েছে স্থানীয় পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর। বাগানে কর্মরত শ্রমিক মংচিং মারমা জানান, আগে অভিজ্ঞতা না থাকলেও এখানে কাজ করে তিনি আলুবোখারা গাছের পরিচর্যা, ছাঁটাই ও ফল সংগ্রহের আধুনিক কৌশল রপ্ত করেছেন। এতে তার পরিবারের ভরণ-পোষণের খরচ চালানো সহজ হয়েছে।
তবে পাহাড়ের পতিত জমিতে এই বিদেশি ফলের এমন নীরব বিপ্লব ও বাণিজ্যিক সম্ভাবনা তৈরি হলেও খাগড়াছড়ি জেলা কৃষি উপ-পরিচালকের দপ্তর থেকে এ সংক্রান্ত জেলার কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
অবশ্য মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারা বিষয়টিকে ইতিবাচক হিসেবে দেখছেন। মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি সম্প্রসারণ কর্মকর্তা মো. সেলিম রানা বলেন, “পাহাড়ের অনাবাদি ও পতিত জমিকে কাজে লাগিয়ে যদি এই ফল চাষ সম্প্রসারণ করা যায়, তবে কৃষকদের অর্থনৈতিক আয় বহুলাংশে বৃদ্ধি পাবে। পুষ্টিগুণে অনন্য এই ফলটি মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়াতেও দারুণ কার্যকর।”
মাটিরাঙ্গা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. শাহাবুদ্দিন আহমেদ বলেন, “পার্বত্য অঞ্চলের মাটি ও জলবায়ু চেরি আলুবোখারা চাষের জন্য অত্যন্ত অনুকূল। এতে তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত কম সার ও কীটনাশক প্রয়োজন হয়, ফলে নামমাত্র খরচে কৃষকরা লাভবান হতে পারেন। পাহাড়ি এলাকায় বাণিজ্যিকভাবে এর চাষ করা গেলে দেশের আমদানি নির্ভরতা কমবে। আলুবোখারা চাষে কৃষকদের যেকোনো ধরনের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও কারিগরি সহযোগিতা দিতে কৃষি বিভাগ সবসময় প্রস্তুত রয়েছে।”