নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
ছবি:
দেশে বিভেদ ও বৈষম্য দূর করে জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করতে সব নাগরিককে নিজেদের ‘বাংলাদেশি’ হিসেবে পরিচয় দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেছেন, রাষ্ট্র ও সমাজে দল, মত, ধর্ম, বর্ণ কিংবা অন্য কোনো পরিচয় যেন মানুষের মধ্যে বিভাজনের কারণ না হয়।
বৃহস্পতিবার (৩ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে শুভ জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সনাতন ধর্মাবলম্বী বিশিষ্টজনদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় অনুষ্ঠানে এসব কথা বলেন প্রধানমন্ত্রী। অনুষ্ঠানে পুরোহিত ও সেবাইতদের মধ্যে সম্মানীও বিতরণ করা হয়।
হিন্দু ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, কৃষ্ণপক্ষের অষ্টমী তিথিতে সনাতন ধর্মের অবতার শ্রীকৃষ্ণের জন্ম। প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে মথুরায় অত্যাচারী শাসক কংসের সময়ে তার আবির্ভাব ঘটে বলে ধর্মীয় শাস্ত্রে উল্লেখ রয়েছে। শ্রীকৃষ্ণের আবির্ভাবের পর কংসের পতন হয়। হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশ্বাস, দুষ্টের দমন ও শিষ্টের পালন ছিল শ্রীকৃষ্ণের অন্যতম ব্রত।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশেও গণতন্ত্রকামী মানুষের অধিকার কেড়ে নিয়ে ‘কংসের’ মতো এক নিষ্ঠুর শাসক দীর্ঘ সময় জনগণের ওপর চেপে বসেছিল। কিন্তু দেড় দশকের বেশি সময় পর দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে গণতন্ত্রকামী মানুষ হাজারো প্রাণের বিনিময়ে ‘কংসরূপী’ সেই ফ্যাসিস্টদের পতন ঘটিয়েছে। এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশে আবার গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হয়েছে।
তিনি বলেন, এখন ভঙ্গুর অর্থনীতি, বিভাজিত প্রশাসন ও অবনতিশীল আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি করে দেশ পুনর্গঠনের কাজ এগিয়ে নেওয়ার পালা।
বিভিন্ন ধর্ম ও মতের মানুষের সহাবস্থানকে বৈচিত্র্যময় সমাজের সৌন্দর্য হিসেবে উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, ‘সংখ্যালঘু’ কিংবা ‘সংখ্যাগুরু’ পরিচয় কোনো নির্দিষ্ট ভূখণ্ডের বাইরে গেলে একইভাবে থাকে না। ইউরোপ বা আমেরিকায় গেলে বাংলাদেশে যারা ‘সংখ্যালঘু’ বা ‘সংখ্যাগুরু’ হিসেবে পরিচিত, তারাও সেখানে কথিত ‘সংখ্যালঘু’। তাই বর্তমান বৈশ্বিক বাস্তবতায় এ ধরনের পরিচয়কে মুখ্য বিষয় হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
রাষ্ট্র ও সমাজে দল, মত, ধর্ম, বর্ণ ও পরিচয়ের ভিত্তিতে বিভেদ-বৈষম্য ঠেকাতে দেশের সব নাগরিককে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্বাধীনতার ঘোষকের রাজনৈতিক দর্শন ‘বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ’-এর কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, দেশের প্রতিটি নাগরিকের গর্বিত পরিচয়—‘আমরা বাংলাদেশি’।
তিনি আরও বলেন, বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরে দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে মানুষ পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির সঙ্গে নিজ নিজ ধর্ম ও সংস্কৃতি পালন করে আসছে।
তবে সময়ে সময়ে ‘কংস’ চরিত্রের কিছু মানুষ রাষ্ট্র ও সমাজে বিভেদ-বিরোধ উসকে দেওয়ার চেষ্টা করেছে বলেও মন্তব্য করেন প্রধানমন্ত্রী। সমাজবিরোধী কোনো অপশক্তি যাতে আবার মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে না পারে এবং বিদ্যমান সম্প্রীতির পরিবেশ কেউ যাতে নষ্ট করতে না পারে, সে জন্য সবাইকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি। নাগরিক হিসেবে পারস্পরিক সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতির বন্ধন অটুট রাখাকে সবার দায়িত্ব বলেও উল্লেখ করেন।
জন্মাষ্টমী উপলক্ষে সবাইকে ধর্মীয় সম্প্রীতি, সহনশীলতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সৌহার্দ্যের বন্ধন আরও দৃঢ় করার আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী।
দেশকে অস্থিতিশীল করার উদ্দেশ্যে বিভিন্ন মহল গুজব ছড়াচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে মানুষকে উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা চলছে উল্লেখ করে কোনো ধরনের সাম্প্রদায়িক উসকানি বা বিদ্বেষ যাতে সামাজিক অস্থিরতার কারণ না হয়, সে বিষয়ে সবাইকে সজাগ থাকার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রতিটি নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার অঙ্গীকারবদ্ধ। দেশের সার্বভৌমত্ব সুসংহত করে সমৃদ্ধ ও স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে নাগরিকদের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন জরুরি।
এ লক্ষ্যেই সরকার ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড, স্পোর্টস কার্ড এবং সব ধর্মের ধর্মীয় গুরুদের জন্য সম্মানী ভাতা দেওয়াসহ বিভিন্ন উদ্যোগ বাস্তবায়ন করছে বলে জানান তিনি।
বর্তমান সরকার একটি কল্যাণমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে চায় উল্লেখ করে তারেক রহমান বলেন, রাষ্ট্র তার সামর্থ্য অনুযায়ী দল, মত, ধর্ম ও বর্ণ নির্বিশেষে নাগরিকদের প্রয়োজনীয় সহায়তা দেবে। একই সঙ্গে নাগরিকরাও রাষ্ট্রের প্রতি তাদের দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করবেন।
তিনি বলেন, ‘রাষ্ট্র-সরকার এবং নাগরিকদের’ মধ্যকার পারস্পরিক ‘দায়িত্ব-আস্থা এবং আলাপের’ মাধ্যমেই সবার প্রত্যাশিত কল্যাণরাষ্ট্র গড়ে উঠবে। কোনো নাগরিক যাতে পিছিয়ে না থাকেন, তা নিশ্চিত করতে সরকার প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলেও জানান তিনি। এ জন্য সম্মিলিত উদ্যোগ ও সহযোগিতার ওপর গুরুত্বারোপ করেন প্রধানমন্ত্রী।
তারেক রহমান বলেন, এই দেশ সবার। নাগরিক হিসেবে দেশে সবার অধিকার সমান।
নিজ নিজ ধর্মীয় বিশ্বাস ও সংস্কৃতি অনুযায়ী জীবন পরিচালনা করা প্রতিটি নাগরিকের সাংবিধানিক মৌলিক অধিকার উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার। ধর্ম যার যার, নিরাপত্তা পাবার অধিকার সবার’।
শুভ জন্মাষ্টমীর পর আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজার প্রসঙ্গও তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি সবাইকে শান্তি, স্বস্তি ও নিরাপত্তার সঙ্গে সব ধর্মীয় উৎসব পালনের আহ্বান জানান।
শুভ জন্মাষ্টমীর শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি আগাম শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা জানিয়ে বক্তব্য শেষ করেন প্রধানমন্ত্রী।