থাইল্যান্ডে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংক বৈঠক
আন্তর্জাতিক ডেস্ক
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, জ্বালানি সংকট ও ক্রমবর্ধমান সুদহারের চাপে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এসব সংকটের প্রভাব মোকাবিলার উপায় নিয়ে আলোচনা করতে চলতি সপ্তাহে থাইল্যান্ডে সমবেত হচ্ছেন বিভিন্ন দেশের অর্থমন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
ইরানকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যুদ্ধের কারণে সৃষ্ট মূল্যস্ফীতি, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি ও জনদুর্ভোগ আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) এবং বিশ্বব্যাংকের বার্ষিক সভায় প্রধান আলোচ্য বিষয় হয়ে উঠবে। প্রায় তিন বছর পর প্রথমবারের মতো ওয়াশিংটনের বাইরে অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে এ সভা। খবর রয়টার্সের।
এক মার্কিন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এবারের সভায় অংশ নিচ্ছেন না যুক্তরাষ্ট্রের অর্থমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট। অভ্যন্তরীণ কাজে ব্যস্ত থাকায় তাঁর পরিবর্তে দুজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তাকে পাঠাচ্ছেন তিনি।
গুরুত্বপূর্ণ এই আন্তর্জাতিক সম্মেলনে মার্কিন অর্থমন্ত্রীর অনুপস্থিতি অন্য দেশের প্রতিনিধিদের হতাশ করতে পারে। বিশেষ করে ইরান ও রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতের (আইসিসি) ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞাকে কেন্দ্র করে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উত্তেজনার মধ্যে তাঁর এ সিদ্ধান্ত তাৎপর্যপূর্ণ বলে মনে করা হচ্ছে।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট অজয় বাঙ্গা রয়টার্সকে বলেন, ইরান যখন বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ পথ হরমুজ প্রণালি বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি আশঙ্কার তুলনায় ভালো অবস্থানে ছিল। তবে এখন পরিস্থিতি আবারও চাপের মুখে পড়ছে। ডিজেলের আকাশচুম্বী দাম, সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং সম্ভাব্য সুপার এল নিনোর প্রভাব—সব মিলিয়ে বিশ্ব অর্থনীতির ওপর চাপ বাড়ছে।
যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের চাপে জি-৭ দেশগুলো তাদের জরুরি মজুত থেকে ১০ কোটি ব্যারেল ডিজেল ও অপরিশোধিত তেল বাজারে ছাড়তে সম্মত হয়েছে। আগামী নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমাতে আগ্রহী ট্রাম্প। ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে তাঁর দল রিপাবলিকান পার্টি।
শুক্রবার ট্রাম্প রাশিয়ার সঙ্গে একটি চুক্তির ঘোষণা দিয়েছেন। এর ফলে বিশ্ববাজারে আরও বেশি ডিজেল সরবরাহের সুযোগ তৈরি হবে এবং ইউক্রেন যুদ্ধের জন্য মস্কোর আয়ের ওপর আরোপিত মার্কিন নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে শিথিল করা হবে। এ পদক্ষেপের তীব্র সমালোচনা করেছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি।
২৮ ফেব্রুয়ারি যুদ্ধ শুরুর পর থেকে স্থলভাগের বাণিজ্যিক মজুতাগার থেকে এক বিলিয়ন বা ১০০ কোটি ব্যারেলের বেশি তেল বাজারে ছাড়া হয়েছে। তবে শিল্প খাতের নির্বাহীরা বলছেন, বিশ্ববাজারে ব্যবহারের উপযোগী তেলের মজুত কমে আসছে। এতে বাজারের অস্থিতিশীলতা বাড়ছে এবং তেলের দামের ওপর ঊর্ধ্বমুখী চাপ তৈরি হচ্ছে।
বাঙ্গা জানান, বিশ্বব্যাংক আপাতত বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সংশোধন করছে না। তবে পরিস্থিতির ওপর নিবিড় নজর রাখছে সংস্থাটি। তিনি বলেন, মূল বিষয়টি শুধু এল নিনোর প্রভাব নয়; বরং বিভিন্ন সংকটের সম্মিলিত প্রভাব। সারের দাম, জ্বালানি ব্যয় ও ঋণের পরিস্থিতি মিলিয়ে নতুন নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আগামী মাসগুলোতে কী ধরনের পরিস্থিতির জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে, সে বিষয়ে সবাইকে আরও সতর্ক হতে হবে।
ক্রমবর্ধমান ঋণের বোঝা
আইএমএফের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ক্রিস্টালিনা জর্জিয়েভাও আসন্ন বৈঠকের আগে দেওয়া বক্তব্যে একই ধরনের সতর্কবার্তা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘শীতকাল ঘনিয়ে আসছে।’
২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ শতাংশ হবে—এমন পূর্বাভাসে বড় কোনো পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়নি আইএমএফ। আগামী বছরের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস সামান্য বাড়ানো হতে পারে। তবে ইউক্রেন ও উপসাগরীয় দেশগুলোর মতো কিছু অঞ্চলের পূর্বাভাস কমানো হতে পারে।
গত মঙ্গলবার প্রকাশিত আইএমএফের এক গবেষণায় দেখা গেছে, খাদ্য ও জ্বালানির দামে আকস্মিক ও বড় ধরনের বৃদ্ধি ক্রমেই সংকটের সাধারণ কারণ হয়ে উঠছে। এ ধরনের পরিস্থিতি দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতির আশঙ্কা বাড়ায়, দারিদ্র্যকে আরও তীব্র করে এবং অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি সৃষ্টি করে।
নীতিনির্ধারকদের অন্যতম বড় উদ্বেগ সরকারি ঋণের ক্রমবর্ধমান বোঝা। এ ঋণ অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিকে বাধাগ্রস্ত করার পাশাপাশি মূল্যস্ফীতির চাপও বাড়াচ্ছে। আইএমএফের হিসাবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর সরকারি ঋণ সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছে এবং ২০৩০ সালের আগেই তা মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ১০০ শতাংশ ছাড়িয়ে যেতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন উন্নত অর্থনীতিগুলোতে ঋণ ও জিডিপির অনুপাত সবচেয়ে বেশি। তবে উদীয়মান বাজার ও স্বল্প আয়ের দেশগুলোও বিশেষ ঝুঁকির মুখে রয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের উচ্চ সুদহারের কারণে এসব দেশ থেকে পুঁজি বেরিয়ে যাওয়া, এল নিনোর প্রভাব এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তায় (এআই) বিনিয়োগের ঘাটতি তাদের অর্থনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
উদীয়মান বাজারের উদ্বেগ
উচ্চ সরকারি ঋণের কারণে উন্নয়নশীল দেশগুলো বিশেষ ঝুঁকিতে রয়েছে। এসব দেশের ঋণের একটি বড় অংশ ভবিষ্যতে আরও উচ্চ সুদহারে পুনঃঅর্থায়ন করতে হতে পারে। উন্নয়নশীল দেশগুলোতে গড়ে ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় ইতিমধ্যে মোট রাজস্বের ১০ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে।
কোভিড সংকটের শুরুর দিকে জি-২০ নেতারা দরিদ্রতম দেশগুলোর ঋণ পরিশোধ সাময়িকভাবে স্থগিত রাখার ঘোষণা দিয়েছিলেন। তবে এবার এ ধরনের উদ্যোগ নেওয়ার আগ্রহ তেমন দেখা যাচ্ছে না। জি-২০ দেশগুলোর কূটনীতিকদের মতে, ঋণের উচ্চমাত্রা ও রাজনৈতিক চাপ নতুন উদ্যোগের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক স্বল্প আয়ের দেশ ঋণ কর্মসূচি নিয়ে আইএমএফের নতুন সুপারিশমালা সম্পর্কে উদ্বিগ্ন। এসব সুপারিশে ঋণ অনুমোদনের শর্ত হিসেবে তুলনামূলক কমসংখ্যক, তবে গভীর ও কঠোর সংস্কারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এতে শেষ পর্যন্ত ব্যয় সংকোচন ও কৃচ্ছ্রসাধনের মতো কষ্টদায়ক পদক্ষেপ নিতে হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
ইউরোড্যাডের ঋণবিষয়ক ন্যায়বিচার কর্মী ইয়োলান্ডা ফ্রেস্নিলো বলেন, ঋণ পরিশোধের ব্যয় বৃদ্ধি এবং আইএমএফের শর্তের কারণে দেশগুলো ইতিমধ্যে ব্যয় সংকোচন করছে। তাঁর আশঙ্কা, শর্তসংক্রান্ত নীতির এই পর্যালোচনা পরিস্থিতিকে আরও খারাপের দিকে নিয়ে যেতে পারে।
তিনি উদাহরণ হিসেবে কেনিয়ার কথা উল্লেখ করেন। দেশটি সরকারি ব্যয় কমানো ও কর বাড়ানোর উদ্যোগের মাধ্যমে ঋণ পুনর্গঠনের পরিস্থিতি এড়াতে সক্ষম হয়েছিল। তবে এসব পদক্ষেপের কারণে ব্যাপক বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়, বিশেষ করে তরুণদের মধ্যে।
অনেক উন্নয়নশীল দেশ যে তীব্র সংকটের মুখোমুখি হয়েছে, তা যথাযথভাবে স্বীকার না করলে আইএমএফের বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
নিরাপত্তা ও অর্থায়ন নিয়ে উদ্বেগ
ব্যাংককগামী ফ্লাইটগুলো প্রায়ই মধ্যপ্রাচ্যের আকাশসীমা ব্যবহার করে। সৌদি আরবের বিমানবন্দরগুলোতে সাম্প্রতিক হামলার প্রেক্ষাপটে থাইল্যান্ডের রাজধানীতে আসা ১০ হাজারের বেশি যাত্রীর নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
আইএমএফ ও বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ বার্ষিক সম্মেলন মরক্কোতে অনুষ্ঠিত হয়েছিল ইসরায়েলে হামাসের হামলার আগে। ওই হামলার পর গাজায় ব্যাপক বোমাবর্ষণ শুরু করে ইসরায়েল। এতে ৭৪ হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন এবং ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডটি ব্যাপকভাবে ধ্বংস হয়েছে।
আটলান্টিক কাউন্সিলের আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিভাগের ভাইস প্রেসিডেন্ট জশ লিপস্কি বলেন, তিন বছর পর জাতীয় নিরাপত্তা ও আন্তর্জাতিক অর্থব্যবস্থার মধ্যকার সম্পর্ক এখন স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। অথচ ওই সময় অর্থনৈতিক নীতিনির্ধারকেরা হামাসের হামলাকে অর্থনৈতিক বিষয় হিসেবে বিবেচনা করেননি।
লিপস্কি বলেন, এর ব্যাপক বৈশ্বিক প্রভাব পড়েছে। ইরান ও হরমুজ প্রণালি বন্ধ হয়ে যাওয়ার মতো বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে তিন বছর আগের ঘটনার সরাসরি যোগসূত্র রয়েছে।