আন্তর্জাতিক ডেস্ক
তীব্র রাজনৈতিক চাপের মুখে অবশেষে পদত্যাগের ঘোষণা দিয়েছেন ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী কিয়ার স্টারমার (Keir Starmer)। সোমবার (২২ জুন) লন্ডনের ১০ ডাউনিং স্ট্রিটের সামনে এক আবেগঘন বক্তৃতায় তিনি জানান, গ্রীষ্মকালীন অবকাশ শেষে নতুন প্রধানমন্ত্রী দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। একই সঙ্গে নতুন দলীয় প্রধান ও দেশের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী নির্বাচনের প্রক্রিয়া শুরু করতে তিনি নিজের দল লেবার পার্টিকে নির্দেশনা দিয়েছেন।
যুক্তরাজ্যের প্রভাবশালী সংবাদমাধ্যম বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, কিয়ার স্টারমারের এই আকস্মিক বিদায়ের পর ব্রিটেনের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রী কে হচ্ছেন—তা নিয়ে জোর জল্পনা-কল্পনা শুরু হয়েছে। সম্ভাব্য প্রার্থীদের তালিকায় বেশ কয়েকজন হেভিওয়েট নেতার নাম উঠে এলেও রেসে সবচেয়ে এগিয়ে রয়েছেন অ্যান্ডি বার্নহ্যাম।
উত্তরাধিকারী নির্বাচনের এই দৌড়ে প্রধান যে নামগুলো আলোচনাধীন রয়েছে, তা নিচে তুলে ধরা হলো-
১. অ্যান্ডি বার্নহ্যাম— ‘কিং অব দ্য নর্থ’
লেবার পার্টির এমপি এবং সাধারণ ভোটারদের মাঝে এই মুহূর্তে সবচেয়ে জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব অ্যান্ডি বার্নহ্যাম। প্রায় এক দশক ধরে ‘গ্রেটার ম্যানচেস্টার’-এর মেয়র হিসেবে সফলভাবে দায়িত্ব পালন করায় তাঁর ঝুলিতে রয়েছে দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। রাজনীতিতে তিনি 'কিং অব দ্য নর্থ' নামেও বেশ পরিচিত।
বর্তমান অবস্থান: সবশেষ গত শুক্রবার পার্লামেন্টের একটি উপ-নির্বাচনে জয়লাভ করে তিনি পুনরায় কমন্সে ফিরে এসেছেন এবং নিজের অবস্থান আরও পাকাপোক্ত করেছেন।
পূর্ব অভিজ্ঞতা: ২০০১ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত তিনি লি (Leigh) আসনের এমপি ছিলেন এবং ওই সময়ে স্বাস্থ্য ও সংস্কৃতিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব সামলেছেন। এর আগে ২০১০ ও ২০১৫ সালে দুবার দলীয় প্রধান হওয়ার লড়াইয়ে নামলেও তিনি পরাজিত হয়েছিলেন।
চ্যালেঞ্জ: প্রধানমন্ত্রী পদের লড়াইয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নামতে হলে তাঁর অন্তত ৮১ জন লেবার এমপির সমর্থন প্রয়োজন হবে।
২. ওয়েস স্ট্রিটিং
২০২৪ সালে লেবার পার্টি ক্ষমতায় আসার পর স্বাস্থ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেছিলেন বিচক্ষণ নেতা ওয়েস স্ট্রিটিং। তবে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে গত মে মাসে তিনি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন।
সাফল্য ও জনপ্রিয়তা: ব্রিটেনের জাতীয় স্বাস্থ্যসেবা বা এনএইচএস (NHS)-এর চিকিৎসায় অপেক্ষমাণ রোগীদের দীর্ঘ তালিকা (Waiting List) কমিয়ে আনাকে তাঁর অন্যতম বড় সাফল্য বিবেচনা করা হয়। দলের মধ্যপন্থী ও ডানপন্থীদের মধ্যে তাঁর ব্যাপক সমর্থন রয়েছে।
চ্যালেঞ্জ: দলের ভেতর তাঁর মাত্রাতিরিক্ত ‘ডানপন্থী’ ভাবমূর্তির কারণে সাধারণ তৃণমূল সদস্যদের ভোট পাওয়া তাঁর জন্য কঠিন হতে পারে।
৩. অ্যাঞ্জেলা রায়নার
যুক্তরাজ্যের সাবেক উপ-প্রধানমন্ত্রী এবং বর্তমান ব্রিটিশ রাজনীতির অন্যতম প্রভাবশালী নারী ব্যক্তিত্ব অ্যাঞ্জেলা রায়নার। অত্যন্ত দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে এসে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষাগত যোগ্যতা ছাড়াই ১৬ বছর বয়সে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হওয়া রায়নারের রাজনৈতিক উত্থান এক অবিশ্বাস্য গল্প।
রাজনৈতিক ক্যারিয়ার: কেয়ার ওয়ার্কার হিসেবে কাজ করার সময় ট্রেড ইউনিয়নের মাধ্যমে রাজনীতিতে আসেন। ২০১৫ সালে প্রথমবার এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর জেরেমি করবিনের ছায়া মন্ত্রিসভায় আবাসন মন্ত্রীর দায়িত্ব পালন করেন। গৃহনির্মাণ বৃদ্ধি ও ভাড়াটেদের অধিকার আমূল সংস্কারে তিনি বড় ভূমিকা রেখেছিলেন।
চ্যালেঞ্জ: ২০২৫ সালে একটি বাড়ি কেনার সময় যথাযথ ট্যাক্স বা কর পরিশোধ না করার অভিযোগ ওঠার পর তিনি নাটকীয়ভাবে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন, যা তাঁর জনপ্রিয়তায় কিছুটা দাগ ফেলেছে।
অন্যান্য সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বী
এই তিন হেভিওয়েট নেতা ছাড়াও সাবেক জ্বালানি মন্ত্রী এড মিলিব্যান্ড-এর নাম আলোচনায় এসেছিল, তবে তিনি নিজেই সেই সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, "আমার জন্য সেই অধ্যায় শেষ।"
এছাড়া বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী শাবানা মাহমুদ এবং প্রতিরক্ষা প্রতিমন্ত্রী ও সাবেক রয়্যাল মেরিন কর্মকর্তা আল কার্নস-এর নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনা ব্যালটে রয়েছে। তবে শাবানা মাহমুদের কিছু অভিবাসন নীতি নিয়ে বিতর্ক থাকায় সাধারণ দলীয় সদস্যদের সমর্থন পাওয়া নিয়ে কিছুটা সংশয় রয়েছে।
লেবার পার্টির অভ্যন্তরীণ নিয়ম অনুযায়ী, সংসদ সদস্যরা গ্রীষ্মকালীন ছুটির মধ্যে নতুন নেতা নির্বাচন প্রক্রিয়া সম্পন্ন করবেন, যাতে আগামী সেপ্টেম্বরের পার্লামেন্ট অধিবেশন শুরুর আগেই ব্রিটেন তার নতুন প্রধানমন্ত্রীকে স্বাগত জানাতে পারে।