নিজস্ব প্রতিবেদক
চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের ক্রমবর্ধমান বাণিজ্যিক, অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্কের কারণে বিভিন্ন শিল্পখাতে চীনা ভাষায় দক্ষ জনবলের চাহিদা বাড়ছে। পরিবর্তিত দেশীয় ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের প্রয়োজনের সঙ্গে দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমকে আরও যুগোপযোগী, মানসম্মত ও কর্মসংস্থানমুখী করতে দেশে প্রথমবারের মতো চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজের কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড (সিএস) ও কোর্স অ্যাক্রিডিটেশন ডকুমেন্ট (সিএডি) প্রণয়ন করেছে জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (এনএসডিএ)।
দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে প্রণীত এসব কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড ও কারিকুলামের প্রাসঙ্গিকতা এবং শ্রমবাজারের উপযোগিতা যাচাই করতে সোমবার (২৫ আগস্ট) এনএসডিএ সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত ভ্যালিডেশন কর্মশালার সমাপনী অনুষ্ঠানে এ তথ্য জানানো হয়।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ। গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশে নিযুক্ত চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন। এনএসডিএর নির্বাহী চেয়ারম্যান ও সরকারের সচিব ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন বাংলাদেশ-চায়না ফ্রেন্ডশিপ অ্যাসোসিয়েশনের (বিসিএফএ) সভাপতি অ্যাডভোকেট নাজমুল হক নান্নু এবং ইনফরমাল সেক্টর ইন্ডাস্ট্রি স্কিলস কাউন্সিলের (আইএসসি) চেয়ারম্যান মির্জা নুরুল গনি শোভন।
চীনা ভাষাকে শুধু যোগাযোগের দক্ষতা হিসেবে নয়, কর্মসংস্থান ও পেশাগত দক্ষতার একটি স্বতন্ত্র অকুপেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠা করাই এ উদ্যোগের অন্যতম লক্ষ্য। এর ফলে ভাষা শেখার পাশাপাশি নির্দিষ্ট কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতার একটি মানসম্মত কাঠামো তৈরি হবে।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে মো. ইসমাইল জবিউল্লাহ বলেন, রোবটিক্স, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ও আধুনিক প্রযুক্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চীন দ্রুত অগ্রসর হচ্ছে। বাংলাদেশের জাতীয় স্বার্থ ও পরিবর্তিত বৈশ্বিক ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ ও সহযোগিতামূলক সম্পর্ক আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি। অতীতে উন্নয়নের নামে অবকাঠামো নির্মাণ হলেও তা প্রত্যাশিত কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারেনি। তাই দক্ষতা উন্নয়ন, আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে সুযোগ সৃষ্টি এবং চীনের সঙ্গে সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে তরুণদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে হবে।
ভাষাগত বাধা দূর করতে ঢাকা থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থী, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী, কর্মজীবী ও দক্ষ কর্মীদের জন্য অনলাইন, হাইব্রিড ও প্রযুক্তিনির্ভর প্ল্যাটফর্মে চীনা ভাষা শেখার সুযোগ তৈরির ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
তিনি বলেন, চীনা ভাষার দক্ষতা কাঠামো বাংলাদেশের শিক্ষার্থীদের চীনে উচ্চশিক্ষার সুযোগও সহজ করতে পারে। ভাষা শুধু যোগাযোগের মাধ্যম নয়; এটি একটি দেশের সংস্কৃতি, ইতিহাস, মূল্যবোধ ও সভ্যতাকে বোঝারও গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। বাংলাদেশ ও চীনের ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পর্ক আরও গভীর করতে চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র, বই ও ডিজিটাল কনটেন্টসহ যৌথ সাংস্কৃতিক উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
চীনের রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে সহযোগিতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র শিক্ষা। এ খাতে দুই দেশের সহযোগিতা আরও বাড়বে।
তিনি বলেন, চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক অঞ্চলে বাংলাদেশের নাগরিকদের কর্মসংস্থান ও কাজের সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে চীনা ভাষায় দক্ষতা বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। চীনা ভাষায় দক্ষতা অর্জনের মাধ্যমে তরুণ ও কর্মজীবীরা চীনা প্রতিষ্ঠান ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যোগাযোগ করতে পারবেন এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সহযোগিতার সুফল কাজে লাগানোর সুযোগ বাড়বে।
সভাপতির বক্তব্যে এনএসডিএর নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ ও চীনের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, শিল্প, শিক্ষা ও মানবসম্পদ সহযোগিতা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে চীনা ভাষায় দক্ষ জনবলের চাহিদাও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
তিনি বলেন, চীনা ভাষাকে শুধু ভাষাগত দক্ষতা হিসেবে না দেখে কর্মসংস্থান, পেশাগত যোগাযোগ ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে প্রবেশের গুরুত্বপূর্ণ দক্ষতা হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন। শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ দক্ষতা তৈরির লক্ষ্যেই এনএসডিএ চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজের ওপর কম্পিটেন্সি-বেজড কারিকুলাম প্রণয়ন করেছে।
দেশি-বিদেশি চীনা ভাষা বিশেষজ্ঞ, চীনা প্রতিষ্ঠান, শিল্পখাত ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের মতামতের ভিত্তিতে কর্মসংস্থানমুখী এ কারিকুলাম চূড়ান্ত করা হয়েছে বলে জানান তিনি। বাংলাদেশে চীনা প্রতিষ্ঠান, ভাষা শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও প্রশিক্ষণ সংস্থার সঙ্গে সহযোগিতা বাড়িয়ে চীনা ভাষা প্রশিক্ষণকে কর্মসংস্থানের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করার ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
ভ্যালিডেশন কর্মশালায় চীনা ভাষা শেখার জন্য প্রয়োজনীয় জ্ঞান, দক্ষতা ও সক্ষমতা এবং সংশ্লিষ্ট শ্রমবাজারের চাহিদা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। কম্পিটেন্সি স্ট্যান্ডার্ড ও কোর্স অ্যাক্রিডিটেশন ডকুমেন্ট তৈরির লক্ষ্যে গত ১৬ থেকে ১৯ আগস্ট চার দিনব্যাপী ডেভেলপমেন্ট কর্মশালা অনুষ্ঠিত হয়। এরপর দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ, শিল্পখাতের প্রতিনিধি ও অন্যান্য অংশীজনের মতামতের ভিত্তিতে ভ্যালিডেশন কর্মশালার মাধ্যমে কারিকুলাম প্রণয়নের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
এ উদ্যোগের ফলে এনএসডিএ নিবন্ধিত প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ কোর্স চালুর সুযোগ তৈরি হবে। পাশাপাশি প্রশিক্ষণার্থীদের দক্ষতা মূল্যায়ন ও জাতীয়ভাবে স্বীকৃত সনদ দেওয়ার মাধ্যমে দেশি ও আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে তাদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বাড়বে।
কর্মশালায় যৌথ সনদ প্রদানের লক্ষ্যে চীনের কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরের সম্ভাবনা নিয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি বাংলাদেশ ন্যাশনাল কোয়ালিফিকেশনস ফ্রেমওয়ার্কের (বিএনকিউএফ) লেভেল ২ ও ৩-এর সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ অকুপেশনের দক্ষতা কাঠামো তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এটি চাইনিজ ল্যাঙ্গুয়েজ টেস্ট-এইচএসকে লেভেল ১ ও ২-এর সমমানের হবে।
অনুষ্ঠানে এনএসডিএর সদস্য ও পরিচালক, সংশ্লিষ্ট পরামর্শক, শিল্পখাতের প্রতিনিধি, প্রশিক্ষণ প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং অন্যান্য অংশীজন উপস্থিত ছিলেন।