আমজাদ হোসেন
স্বাস্থ্যসেবা একটি রাষ্ট্রের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। নাগরিকের জীবনের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত এই খাতে সামান্য অব্যবস্থাপনাও মানুষের দুর্ভোগ বাড়িয়ে তোলে। তাই হাসপাতালকে শুধু চিকিৎসা দেওয়ার প্রতিষ্ঠান নয়, বরং মানুষের আস্থা ও মানবিকতার কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার বিকল্প নেই। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী জহির উদ্দিন স্বপনের বক্তব্যে রোগীবান্ধব চিকিৎসাসেবা, আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এবং সুশাসনের যে বিষয়গুলো উঠে এসেছে, সেগুলো নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ। তবে এসব লক্ষ্য বাস্তবায়নে কার্যকর পদক্ষেপই এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন।
দেশের সরকারি হাসপাতালগুলোতে প্রতিদিন বিপুলসংখ্যক রোগী চিকিৎসা নিতে আসেন। কিন্তু চিকিৎসক ও নার্সের সংকট, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির অপ্রতুলতা, দীর্ঘ অপেক্ষা, শয্যাসংকট, দালালচক্রের দৌরাত্ম্য এবং অনেক ক্ষেত্রে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ স্বাস্থ্যসেবাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। ফলে অনেক মানুষ বাধ্য হয়ে ব্যয়বহুল বেসরকারি হাসপাতালের দিকে ঝুঁকছেন কিংবা চিকিৎসার জন্য বিদেশে যাচ্ছেন। এতে ব্যক্তি যেমন আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন, তেমনি দেশের বিপুল বৈদেশিক মুদ্রাও বিদেশে চলে যাচ্ছে।
স্বাস্থ্যখাতে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ বা নতুন যন্ত্রপাতি সংযোজন করলেই কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসবে না। প্রয়োজন দক্ষ ব্যবস্থাপনা, জবাবদিহিমূলক প্রশাসন এবং রোগীকেন্দ্রিক সেবার সংস্কৃতি। হাসপাতালে প্রতিটি রোগী যেন সম্মান, আন্তরিকতা ও সময়মতো চিকিৎসা পান—এটি নিশ্চিত করাই হওয়া উচিত প্রধান অগ্রাধিকার। একই সঙ্গে চিকিৎসক, নার্স ও স্বাস্থ্যকর্মীদের জন্য প্রয়োজন নিয়মিত প্রশিক্ষণ, নিরাপদ কর্মপরিবেশ এবং পেশাগত মূল্যায়নের কার্যকর ব্যবস্থা।
প্রযুক্তিনির্ভর স্বাস্থ্যসেবা বর্তমান সময়ের অপরিহার্য বাস্তবতা। ডিজিটাল রোগী ব্যবস্থাপনা, অনলাইন রিপোর্ট, ই-হেলথ রেকর্ড এবং স্বচ্ছ প্রশাসনিক কাঠামো দুর্নীতি ও হয়রানি কমাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে প্রযুক্তির সুফল তখনই মিলবে, যখন তার সঙ্গে দক্ষ জনবল ও কার্যকর তদারকি যুক্ত হবে।
সরকার স্বাস্থ্যখাতে নানা উন্নয়ন উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এখন প্রয়োজন সেই উদ্যোগগুলোর বাস্তব ফল জনগণের কাছে পৌঁছে দেওয়া। প্রতিটি সরকারি হাসপাতালকে এমন প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে হবে, যেখানে রোগীরা হয়রানি নয়, আস্থা নিয়ে চিকিৎসা নিতে পারবেন।
রোগীবান্ধব স্বাস্থ্যসেবা কেবল একটি স্লোগান নয়; এটি একটি মানবিক রাষ্ট্রের পরিচয়। তাই পরিকল্পনার পাশাপাশি বাস্তবায়ন, জবাবদিহি এবং সেবার মান নিশ্চিত করার মধ্য দিয়েই জনগণের প্রত্যাশা পূরণ সম্ভব। স্বাস্থ্যসেবায় মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে এখন কথার চেয়ে কাজই সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন।