রেহেনা বেগম
বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রাণশক্তি বলা হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে। এই শ্রেণিই শিক্ষা, সংস্কৃতি, কর্মসংস্থান এবং সামাজিক স্থিতিশীলতার অন্যতম ভিত্তি। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতিতে সবচেয়ে বেশি চাপে পড়েছে এই মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো। তাদের জীবন যেন এখন আয়-ব্যয়ের কঠিন সমীকরণে আটকে গেছে।
কয়েক বছর আগেও একটি মধ্যবিত্ত পরিবার মাসিক আয়ের মধ্যে সংসার চালিয়ে কিছু অর্থ সঞ্চয় করতে পারত। এখন সেই সুযোগ প্রায় নেই বললেই চলে। চাল, ডাল, তেল, মাছ, মাংস, ডিম, সবজি—প্রতিটি নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম বেড়েছে। পাশাপাশি বাড়িভাড়া, বিদ্যুৎ, গ্যাস, পরিবহন, চিকিৎসা ও সন্তানের শিক্ষার ব্যয়ও বেড়েছে উল্লেখযোগ্যভাবে। অথচ অধিকাংশ চাকরিজীবীর আয় সেই হারে বাড়েনি।
নিম্ন আয়ের মানুষ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আওতায় কিছুটা সহায়তা পেয়ে থাকেন। অন্যদিকে উচ্চবিত্তের ক্রয়ক্ষমতায় মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব তুলনামূলক কম। কিন্তু মধ্যবিত্ত এক অদ্ভুত সংকটে আটকে থাকে। আত্মসম্মানবোধের কারণে তারা কারও কাছে হাত পাততে পারেন না, আবার অতিরিক্ত ব্যয়ও বহন করতে পারেন না। ফলে নীরবে জীবনযাত্রার মান কমিয়ে দিচ্ছেন। অনেক পরিবার পুষ্টিকর খাবার কম খাচ্ছে, চিকিৎসা পিছিয়ে দিচ্ছে, এমনকি সন্তানের কোচিং বা অতিরিক্ত শিক্ষাও বন্ধ করে দিচ্ছে।
দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধির পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অস্থিরতা, জ্বালানির দাম বৃদ্ধি, আমদানি ব্যয়, সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা এবং বাজারে কিছু অসাধু ব্যবসায়ীর কারসাজির মতো নানা কারণ রয়েছে। তবে কারণ যাই হোক, সাধারণ মানুষের কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো বাজারে গিয়ে ন্যায্যমূল্যে প্রয়োজনীয় পণ্য কেনার সুযোগ নিশ্চিত করা।
এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকারকে আরও কার্যকর বাজার তদারকি, মজুতদারি ও কৃত্রিম সংকট সৃষ্টিকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা, কৃষি উৎপাদনে সহায়তা এবং সরবরাহ ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। একই সঙ্গে মধ্যবিত্তের জন্য কর-সুবিধা, স্বাস্থ্য ও শিক্ষা খাতে ব্যয় কমানোর উদ্যোগ এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা বিবেচনা করা যেতে পারে।
একটি দেশের অর্থনীতি তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তার মধ্যবিত্ত শ্রেণি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে এগিয়ে যেতে পারে। তাই দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ শুধু অর্থনৈতিক নয়, এটি সামাজিক স্থিতিশীলতা ও মানুষের জীবনমান রক্ষারও গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্ত। মধ্যবিত্তের দীর্ঘশ্বাস যেন আর দীর্ঘ না হয়—এ প্রত্যাশাই আজ সবচেয়ে বড়।
লেখকঃ রেহেনা বেগম
শনির আখড়া, দনিয়া, ঢাকা।