চট্টগ্রাম বন্দর
নিজস্ব প্রতিবেদক
চট্টগ্রাম বন্দরে চোরাচালান, পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা এবং শুল্ক ফাঁকির সন্দেহে কাস্টমসের ঝুঁকি ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার (অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড) ব্যবহার করে ‘লক’ করা অন্তত ২৫০টি আমদানি কনটেইনারের অবস্থান শনাক্ত করতে পারছে না চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস। বিষয়টি নিয়ে বন্দর নিরাপত্তা ও শুল্ক ব্যবস্থাপনার কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।
চট্টগ্রাম কাস্টম হাউস সূত্রে জানা গেছে, গত নয় মাসে এসব কনটেইনারের অবস্থান জানতে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হলেও এখন পর্যন্ত কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি।
কাস্টম হাউসের অডিট, ইনভেস্টিগেশন অ্যান্ড রিস্ক ম্যানেজমেন্ট (এআইআর) শাখার নথি অনুযায়ী, ২০২১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ২৫০টি কনটেইনারের খালাস অ্যাসাইকুডা ওয়ার্ল্ড সফটওয়্যারে স্থগিত (লক) করা হয়। এর মধ্যে ২০২১ সালের ৮৩টি, ২০২২ সালের ৬১টি, ২০২৩ সালের ৪০টি এবং ২০২৪ সালের ৬৬টি কনটেইনার রয়েছে। কাস্টমসের বিধি অনুযায়ী, তদন্ত কর্মকর্তাদের কায়িক পরীক্ষা ছাড়া এসব কনটেইনার খালাস হওয়ার সুযোগ নেই।
এআইআর শাখার উপকমিশনার তারেক মাহমুদ বলেন, “কনটেইনারগুলোর অবস্থান জানতে বন্দর কর্তৃপক্ষকে কয়েক দফা চিঠি দেওয়া হয়েছে। সর্বশেষ চলতি বছরের এপ্রিলে আবারও তাগিদ দেওয়া হয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত কোনো উত্তর পাওয়া যায়নি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা নিশ্চিত করে বলতে পারছি না যে সব কনটেইনারই নিখোঁজ। তবে বন্দর কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে কোনো তথ্য না পাওয়ায় অন্তত কিছু কনটেইনার বন্দরে নেই—এমন আশঙ্কা জোরালো হয়েছে।”
কাস্টমস কর্মকর্তাদের ভাষ্য, কনটেইনারগুলোর অবস্থান নিশ্চিত করা না গেলে পণ্য পরীক্ষা, তদন্ত সম্পন্ন কিংবা সংশ্লিষ্ট আমদানিকারকদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
এরই মধ্যে গত এক বছরে চট্টগ্রাম বন্দর থেকে অন্তত তিনটি পণ্যবোঝাই কনটেইনার নিখোঁজ হওয়ার পৃথক ঘটনা তদন্তাধীন রয়েছে। এর মধ্যে একটি ঘটনায় ই-নিলামে কেনা প্রায় ২৭ টন আমদানিকৃত ফ্যাব্রিকভর্তি একটি কনটেইনার বুঝে নিতে গিয়ে ক্রেতা সেটির কোনো সন্ধান পাননি। পরে বন্দর কর্তৃপক্ষও জানায়, যৌথ তদন্তের পরও কনটেইনারটির অবস্থান শনাক্ত করা সম্ভব হয়নি।
তদন্তে আরও উঠে এসেছে, একটি কনটেইনার বাস্তবে ইয়ার্ডে না থাকলেও বন্দরের ডিজিটাল কার্গো ব্যবস্থাপনায় সেটিকে সংরক্ষিত হিসেবে দেখানো হচ্ছিল। এতে বন্দরের ডিজিটাল নজরদারি ও কার্গো ব্যবস্থাপনার নির্ভরযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে চট্টগ্রাম বন্দর কর্তৃপক্ষের বিস্তারিত বক্তব্য পাওয়া যায়নি। ভারপ্রাপ্ত সচিবের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি। এছাড়া বন্দর চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল এস এম মনিরুজ্জামানের কাছেও প্রশ্ন পাঠানো হলেও কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
তবে এর আগে এক সংবাদ সম্মেলনে বন্দর চেয়ারম্যান বলেছিলেন, একটি সংঘবদ্ধ চক্র জাল কাগজপত্র ও ডিজিটাল কারসাজির মাধ্যমে পণ্য খালাসের অপচেষ্টা করছে। ওই চক্রকে শনাক্ত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তায় কাজ করছে বন্দর কর্তৃপক্ষ।
বন্দর ও কাস্টমস-সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, একটি পূর্ণাঙ্গ কনটেইনার বন্দর থেকে খালাসের ক্ষেত্রে একাধিক স্তরের অনুমোদন ও যাচাই প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয়। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত বিপুলসংখ্যক কনটেইনারের অবস্থান নিয়ে অনিশ্চয়তা বন্দর নিরাপত্তা, শুল্ক প্রশাসন এবং রাষ্ট্রীয় নজরদারি ব্যবস্থার কার্যকারিতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে।