নিজস্ব প্রতিবেদক
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, দীর্ঘদিনের ফ্যাসিবাদী শাসনে ভঙ্গুর হয়ে পড়া বাংলাদেশকে এখন পুনর্গঠন করতে হবে। তিনি বলেন, দেড় দশকেরও বেশি সময়ের শোষণ-শাসন বাংলাদেশকে ঋণ ও আমদানিনির্ভর একটি ভঙ্গুর রাষ্ট্রে পরিণত করেছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য, পরিবেশসহ সব ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের কাঠামোগত দুর্বলতা কাটিয়ে দেশ পুনর্গঠনের সময় এসেছে।
সোমবার (১০ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে পাঁচ বছর মেয়াদি কৌশলগত কাঠামো নির্ধারণবিষয়ক জাতীয় সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশ পুনর্গঠনের এ যাত্রায় এসডিজির ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। জনগণের সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে সরকার পাঁচ বছর মেয়াদি একটি কৌশলগত অর্থনৈতিক কাঠামো বাস্তবায়নের উদ্যোগ নিয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনাকে জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে সমন্বয় করা হয়েছে।
তারেক রহমান বলেন, বিএনপির জননীতির দিকে তাকালেই স্পষ্ট হয় যে দলটির পরিকল্পনা ও কর্মসূচি সব সময়ই জনবান্ধব। স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের ১৯ দফা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী মরহুমা খালেদা জিয়ার ‘ভিশন ২০৩০’ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের ৩১ দফায় দেশ ও জনগণের উন্নয়নকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এসব কর্মসূচির সঙ্গে মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল (এমডিজি) ও বর্তমান এসডিজির লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের বড় ধরনের সামঞ্জস্য রয়েছে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ যেভাবে এমডিজি বাস্তবায়নে সাফল্য দেখিয়েছে, এসডিজি বাস্তবায়নেও যথাযথ পদক্ষেপ নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। এসডিজির মূলনীতি ‘নো ওয়ান লেফট বিহাইন্ড’ বা ‘কাউকে পেছনে ফেলে নয়’-এর সঙ্গে বর্তমান সরকারের জননীতিরও মিল রয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সব শ্রেণি-পেশার মানুষের স্বার্থ নিশ্চিত করাই সরকারের নীতি। এ লক্ষ্যেই সরকারের ‘সবার জন্য বাংলাদেশ’ ভাবনা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, সরকারের ‘সংস্কার ও উন্নয়নের পাঁচ স্তম্ভ’-এর মাধ্যমে দারিদ্র্য বিমোচন, সর্বজনীন সামাজিক সুরক্ষা, মানসম্মত শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবা, জেন্ডার সমতা, জলবায়ু সহনশীলতা এবং সুশাসনের মতো এসডিজির গুরুত্বপূর্ণ অগ্রাধিকারগুলো প্রতিফলিত হয়েছে।
স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে উত্তরণ এবং এসডিজি বাস্তবায়নে অর্জিত অগ্রগতি সুসংহত করতে সরকার ‘রিকভারি-রিহ্যাবিলিটেশন-রিকনস্ট্রাকশন’ বা ‘থ্রি-আর’ কৌশল গ্রহণ করেছে বলেও জানান তিনি। এর মাধ্যমে স্বল্পমেয়াদি স্থিতিশীলতা থেকে দীর্ঘমেয়াদি কাঠামোগত রূপান্তর পর্যন্ত সব কার্যক্রম একটি সমন্বিত পরিকল্পনার আওতায় বাস্তবায়ন করা হবে।
তারেক রহমান বলেন, জনগণের ভোটে সরকার গঠনের পর ১৭ ফেব্রুয়ারি থেকেই নারীর সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, কৃষকের স্বার্থ রক্ষা এবং জনস্বাস্থ্য ও চিকিৎসাসেবা সহজ করতে ফ্যামিলি কার্ড, কৃষক কার্ড ও ই-হেলথ কার্ডের মতো সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
এসব কর্মসূচির মাধ্যমে প্রান্তিক কৃষক, স্বল্প আয়ের পরিবার ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সরাসরি ভর্তুকি, কৃষি উপকরণ, আর্থিক সহায়তা ও স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি স্পোর্টস কার্ড চালু এবং দেশের ইমাম-মুয়াজ্জিনসহ বিভিন্ন ধর্মের ধর্মীয় নেতাদের সম্মানী ভাতার আওতায় আনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, চলতি মেয়াদের মধ্যেই পর্যায়ক্রমে দেশের সম্ভাব্য প্রতিটি নাগরিককে সামাজিক সুরক্ষা বলয় ও আর্থিক সহায়তার কাঠামোর আওতায় আনার পরিকল্পনা সরকারের রয়েছে।
তিনি জানান, ‘এসডিজি ভিলেজ’ কার্যক্রমের অংশ হিসেবে রাঙামাটির কাপ্তাই উপজেলার মিতিঙ্গাছড়ি, খুলনার দাকোপ উপজেলার পানখালী এবং দিনাজপুরের বোচাগঞ্জ উপজেলার নাফানগর—এই তিনটি গ্রামকে এসডিজি স্থানীয়করণের পাইলট মডেল হিসেবে প্রাথমিকভাবে নির্বাচন করা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, এসব গ্রামে ফ্যামিলি কার্ড, হেলথ কার্ড, কৃষক কার্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগের ঋণ, স্কুল ড্রেস, মাদ্রাসাভিত্তিক শিক্ষা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, গ্রাম পর্যটন, ‘ওয়ান ভিলেজ-ওয়ান প্রোডাক্ট’, বৃক্ষরোপণ, খাল খনন ও ইকোট্যুরিজমসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পরীক্ষামূলকভাবে একযোগে বাস্তবায়ন করা হবে। একই সঙ্গে এসব উদ্যোগের প্রভাব পর্যবেক্ষণ করা হবে।
তিনি বলেন, পাইলট প্রকল্পের সাফল্যের ভিত্তিতে ভবিষ্যতে দেশের অন্যান্য গ্রামেও এ মডেল সম্প্রসারণ করা হবে। এসডিজি ভিলেজ সরকারের নির্বাচনি অঙ্গীকারকে আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি উন্নয়ন মডেল হিসেবে বিশ্বের সামনে তুলে ধরার দৃষ্টান্তমূলক প্ল্যাটফর্ম হয়ে উঠবে বলে আশা প্রকাশ করেন তিনি।
এসডিজি বাস্তবায়ন কোনো একক মন্ত্রণালয় বা বিভাগের পক্ষে সম্ভব নয় উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এর সফল বাস্তবায়নে সরকার, বেসরকারি খাত, উন্নয়ন সহযোগী, এনজিও, সুশীল সমাজ, গণমাধ্যম এবং প্রতিটি নাগরিকের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রয়োজন।
তিনি আশা প্রকাশ করেন, তিন দিনের জাতীয় সম্মেলনে সমন্বয়কারী মন্ত্রণালয় ও বিভাগগুলো নিজেদের অগ্রগতি, চ্যালেঞ্জ ও ভবিষ্যৎ করণীয় নিয়ে আলোচনা করে বাস্তবসম্মত ও সময়োপযোগী কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করবে।
আগামী দিনের কর্মপরিকল্পনা সম্পর্কে সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরে তারেক রহমান বলেন, একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে অবাধ নির্বাচন, আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা হবে। পাশাপাশি মানবিক রাষ্ট্রে স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও নাগরিক অধিকার সর্বজনীন করা এবং কল্যাণ রাষ্ট্রে প্রতিটি নাগরিকের অর্থনৈতিক সুযোগ ও ন্যায্যতা নিশ্চিত করা হবে।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘২০৩০ সাল নাগাদ টেকসই উন্নয়ন অভীষ্ট অর্জনের লক্ষ্যে আসুন আমরা সবাই দৃঢ় সংকল্প নিয়ে কাজ করি।’
অনুষ্ঠানে স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী জোনায়েদ সাকি, পরিকল্পনা বিভাগের সচিব এস এম শাকিল আখতার এবং প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা (মন্ত্রী পদমর্যাদা) অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীরসহ সরকারের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।