নিজস্ব প্রতিবেদক
সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস বলেছেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর শুধু অতীতের স্মৃতি সংরক্ষণের স্থান নয়, এটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রেরণার কেন্দ্র।
বুধবার (৫ আগস্ট) রাজধানীতে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এ কথা বলেন।
ড. ইউনূস বলেন, “আমরা পথ হারিয়ে ফেললে এখানে এসে পথ খুঁজে নেবো। আমাদের চিন্তায় যদি কোনো গাফিলতি আসে, এখান থেকেই তার ঠিকানা খুঁজে আবার নতুন করে যাত্রা শুরু করবো।”
তিনি বলেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নানা ধরনের জাদুঘর থাকলেও এ জাদুঘরের বৈশিষ্ট্য সম্পূর্ণ আলাদা। বহু বছরের পুরোনো ইতিহাস নয়, বরং গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাগুলো ঘটার সঙ্গে সঙ্গেই সেসবের স্মারক, দলিল, নিদর্শন এবং মানুষের অনুভূতি সংগ্রহ করে এখানে সংরক্ষণ করা হয়েছে।
“ঘটনা ঘটেছে, আর আমরা তাৎক্ষণিকভাবে সেই ঘটনার প্রতিটি নিদর্শন ও ইতিহাস সংগ্রহ করে জাদুঘরে নিয়ে এসেছি। এটাই আমাদের ইতিহাস সংরক্ষণের এক নতুন অধ্যায়,” বলেন তিনি।
জুলাই আন্দোলনে অংশ নেওয়া তরুণদের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করে ড. ইউনূস বলেন, অনেকেই কোনো পরিকল্পনা ছাড়াই নিজেদের অনুভূতি লিখে গেছেন। পরিবারের বাধা উপেক্ষা করে কেন তারা রাজপথে নেমেছিলেন, তাও চিঠিতে তুলে ধরেছেন। এসব দলিল ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে।
তিনি বলেন, “আমাদের প্রত্যাশা, বাংলাদেশের প্রতিটি তরুণ যেন সেই চিঠির লেখকের মতো হয়। তারা যেন বলে—আমরা নতুন বাংলাদেশ গড়তে এসেছি।”
দেশের প্রতিটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী এবং সাধারণ নাগরিককে অন্তত একবার জাদুঘরটি পরিদর্শনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, “শুধু দেখে চলে যাওয়ার জন্য নয়, এখানে বসে তারা যেন নিজেদের স্বপ্ন, প্রত্যাশা ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা লিখে রেখে যায়।”
ড. ইউনূস আরও বলেন, ভবিষ্যতে এই জাদুঘর সংস্কৃতি, শিল্প, সংগীত, চিত্রকলা এবং সৃজনশীল কর্মকাণ্ডেরও একটি প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হবে।
জাদুঘরে নির্মিত প্রতীকী কবরগুলোর প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, প্রতিটি কবরের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট শহীদের পরিচয় ও আত্মত্যাগের ইতিহাস সংরক্ষিত থাকবে, যাতে মানুষ জানতে পারে কীভাবে এবং কেন তারা জীবন উৎসর্গ করেছিলেন।
তিনি বলেন, “তারা কোনো বিশেষ রাজনৈতিক দলের কর্মী ছিলেন না। তারা ছিলেন সাধারণ পরিবারের সাধারণ ছেলে-মেয়ে। তারা রাজপথে নেমেছিলেন, কারণ তারা বিশ্বাস করতেন—এই বাংলাদেশ আর আগের মতো চলতে পারে না; আমাদের নতুন বাংলাদেশ গড়ে তুলতে হবে।”
জাদুঘর নির্মাণে সংশ্লিষ্টদের প্রশংসা করে নোবেলজয়ী এই অর্থনীতিবিদ বলেন, প্রতিটি নিদর্শন সংগ্রহ করতে দীর্ঘ সময়, কঠোর পরিশ্রম এবং নানা চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে হয়েছে। সেই প্রচেষ্টার ফলেই দেশের মানুষের সামনে ইতিহাসের এই গুরুত্বপূর্ণ দলিল তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে।
বক্তব্যের শেষে তিনি জাদুঘর নির্মাণ ও উদ্বোধনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, “আমি আশা করি, দেশের প্রতিটি মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে অন্তত একবার এখানে আসবেন। শুধু দেখার জন্য নয়, ভাবার জন্য—কেন এটি ঘটেছিল, কীভাবে ঘটেছিল এবং এখান থেকে আমরা ভবিষ্যতে কোন পথে এগোবো।”