নুরুল্লাহ ভূইয়া, চরফ্যাশন (ভোলা)
শীতের আগমনী বার্তার সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয়েছে শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি। আর এই প্রস্তুতিকে ঘিরেই জমে উঠেছে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার বিভিন্ন হাটবাজারে সবজির চারার বেচাকেনা। হাটের দিনগুলোতে পেঁপে, মরিচ, বেগুন, টমেটো, লাউসহ নানা জাতের সবজির চারা নিয়ে বসছেন বিক্রেতারা। পছন্দের চারা কিনতে ভিড় করছেন স্থানীয় কৃষকেরা। বিশেষ করে হাইব্রিড জাতের চারার চাহিদা বেশি। অন্যদিকে, এই মৌসুমি বেচাকেনাকে কেন্দ্র করে বাড়তি আয়ের সুযোগ তৈরি হয়েছে অনেক বিক্রেতার।
উপজেলার চরফ্যাশন বাজার, চেয়ারম্যান হাট, শশীভূষণ, দুলার হাট, দক্ষিণ আইচা বাজারসহ অন্তত দশ-বারটি বড় বাজারে হাটের দিন বসে চারার পসরা। এসব বাজারে বিক্রি হওয়া অধিকাংশ চারা পাইকারি সংগ্রহ করা হয় পিরোজপুরের স্বরূপকাঠি, পাবনা ও যশোর থেকে। পাশাপাশি স্থানীয় চাষিদের উৎপাদিত চারাও বিক্রি করছেন ব্যবসায়ীরা।
চরফ্যাশন বাজারে কথা হয় চারা বিক্রেতা ইদ্রিস মিয়ার সঙ্গে। পেশায় তিনি একজন বোরাকচালক। মূল পেশার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের আশায় প্রায় তিন বছর ধরে বিকেলের দিকে হাটে সবজির চারা বিক্রি করছেন। প্রায় প্রতিদিনের খেয়ায় স্বরূপকাঠি থেকে তাঁর চাহিদা অনুযায়ী চারা আসে। স্থানীয় চাষিদের কাছ থেকেও চারা সংগ্রহ করে বিক্রি করেন তিনি।
ইদ্রিস মিয়া বলেন, প্রতিটি চারা বিক্রি করে এক থেকে দুই টাকা লাভ থাকে। প্রতি চারায় লাভের পরিমাণ কম হলেও বেশি সংখ্যায় বিক্রি হওয়ায় ভালো আয় হয়। এতে মূল পেশার পাশাপাশি সংসারে বাড়তি অর্থের জোগান দিতে পারছেন তিনি।
অন্যদিকে, চরফ্যাশন বাজার, চেয়ারম্যান হাট ও শশীভূষণ বাজারে দীর্ঘদিন ধরে সবজির চারা বিক্রি করছেন জহির মিয়া। প্রায় ১৫-১৬ বছর ধরে এ ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত তিনি। নিজেও একজন কৃষক হওয়ায় চারার গুণগত মান সম্পর্কে তাঁর রয়েছে অভিজ্ঞতা।
জহির মিয়ার মতে, স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত চারার তুলনায় স্বরূপকাঠি থেকে আসা চারাগুলো তুলনামূলক বেশি সতেজ থাকে। সেখানে কচুরিপানার জলাভূমিতে ভাসমান বেড বা ধাপ পদ্ধতিতে সবজির চারা উৎপাদন করা হয়। বেডের নিচে থাকা কচুরিপানা দীর্ঘ সময় আর্দ্রতা ধরে রাখে। ফলে দূর থেকে পরিবহন এবং বাজারে কয়েক দিন রাখার পরও চারাগুলো সহজে শুকিয়ে যায় না। কৃষকেরাও এসব চারা কিনে নিজেদের সুবিধামতো সময়ে জমিতে রোপণ করতে পারেন।
জহির মিয়া বলেন, এলাকার অনেক পরিচিত কৃষক তাঁর কাছ থেকে একসঙ্গে বেশি পরিমাণে চারা কেনেন। এই ব্যবসা থেকে মাসে প্রায় ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা আয় হয় তাঁর। তবে বছরের অন্য সময়ের তুলনায় শীতের আগে চারার বিক্রি কয়েক গুণ বেড়ে যায়। এ সময় শত শত কৃষক শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি হিসেবে বিভিন্ন জাতের চারা কিনতে হাটে আসেন।
হাটে চারা কিনতে আসা সবজিচাষি হারুন তালুকদার বলেন, হাট থেকে চারা কেনার সবচেয়ে বড় সুবিধা হলো, নিজের চোখে দেখে ও যাচাই-বাছাই করে পছন্দমতো চারা কেনা যায়। হাটে পাওয়া চারাগুলো তুলনামূলক বড় হওয়ায় জমিতে রোপণের অল্প দিনের মধ্যেই ফলন পাওয়া যায়। ফলে সঠিক সময়ে সবজি বাজারজাত করে ভালো দাম পাওয়ার সুযোগ থাকে। আজও চরফ্যাশন হাটে তিনি চারজন ব্যবসায়ীর কাছ থেকে শতাধিক হাইব্রিড পেঁপে, বেগুন ও লাউয়ের চারা কিনেছেন। প্রয়োজন হলেই তিনি সবজির চারা কিনতে হাটে চলে আসেন। মূলত ভালো ও সতেজ চারা বেছে নেওয়ার সুযোগ থাকায় হাট থেকেই চারা কিনতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন তিনি।
চরফ্যাশন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ নাজমুল হুদা বলেন, সবজি উৎপাদনে ভালো ফলন পেতে সুস্থ, সবল ও রোগমুক্ত চারা নির্বাচন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। চারা কেনার সময় গাছের বয়স, শিকড়ের অবস্থা, পাতার রং এবং রোগবালাইয়ের লক্ষণ ভালোভাবে দেখে নিতে হবে। বিশেষ করে হাইব্রিড জাতের চারা কেনার ক্ষেত্রে নির্ভরযোগ্য উৎস ও জাতের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। কৃষকেরা সঠিক জাতের মানসম্মত চারা রোপণ করলে সবজি উৎপাদন ও ফলন বাড়াতে সহায়ক হবে।
সব মিলিয়ে চরফ্যাশনের হাটবাজারে সবজির চারার এই জমজমাট বেচাকেনা কেবল শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতিকেই এগিয়ে নিচ্ছে না, তৈরি করছে গ্রামীণ জীবিকার নতুন সম্ভাবনাও। কেউ মূল পেশার পাশাপাশি বাড়তি আয়ের পথ খুঁজে পেয়েছেন, আবার কেউ দীর্ঘদিনের এই ব্যবসাকে গড়ে তুলেছেন জীবিকার প্রধান অবলম্বন হিসেবে। কৃষকের মাঠে সবজি উৎপাদনের স্বপ্ন আর বিক্রেতার জীবিকার গল্প—দুইয়ের মেলবন্ধনে চরফ্যাশনের হাটে এখন চারার বেচাকেনা যেন গ্রামীণ অর্থনীতির এক প্রাণবন্ত চিত্র।