নিজস্ব প্রতিবেদক
এলপিজি বাজারে সরবরাহ সংকট ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ খতিয়ে দেখতে সেপ্টেম্বর মাসে আমদানি ও বিক্রির পূর্ণাঙ্গ তথ্য চেয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। এ জন্য ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়ে দ্রুত হিসাব জমা দিতে বলা হয়েছে।
শনিবার (৩ অক্টোবর) ছুটির দিনে ইস্যু করা ওই চিঠিতে আগামীকাল রোববার (৪ অক্টোবর) তথ্য জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে পাওয়া সেপ্টেম্বরের এলপিজি আমদানির তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ এলপিজি বিক্রির তথ্য চাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আগামীকাল তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। এরপর পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
সেপ্টেম্বরের তৃতীয় সপ্তাহ থেকে দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজি সংকট দেখা দেয়। বাড়তি দামেও অনেক জায়গায় গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না। আমদানিকারকদের কেউ কেউ সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বাড়তি দামে বিক্রির চেষ্টা করছেন—এমন অভিযোগ উঠেছে। পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা এবং গোয়েন্দা তথ্যেও অবৈধভাবে এলপিজি মজুতের বিষয়টি উঠে এসেছে।
কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে ইস্টকোস্ট গ্রুপ, বিএম এলপিজি, পেট্রোম্যাক্স ও যমুনা স্পেসটেক জেভি লিমিটেডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম আলোচনায় এসেছে। এসব অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতেই ১২ আমদানিকারকের কাছে আমদানি ও বিক্রির তথ্য চাওয়া হয়েছে।
খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু বিক্রি ও মজুতের হিসাব নিলেই কারসাজি শনাক্ত হবে—এমন নিশ্চয়তা নেই। তাদের মতে, আমদানিকারকদের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে ব্যাংক হিসাব মিলিয়ে দেখলে প্রকৃত বিক্রির পরিমাণ এবং অতিরিক্ত দামে পণ্য বিক্রির বিষয়টিও যাচাই করা সম্ভব।
বিইআরসির এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, তথ্য পাওয়ার পর সেগুলো যাচাই-বাছাই করা হবে। কাউকে ছাড় দেওয়ার সুযোগ নেই। কোনো প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে অপরাধের প্রমাণ পাওয়া গেলে লাইসেন্স বাতিলসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এদিকে এলপিজি সংকট নিয়ে একাধিক বৈঠক হলেও পরিস্থিতির দৃশ্যমান উন্নতি হয়নি। অনেক এলাকায় এলপিজি পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও কোথাও বিইআরসি নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকার ১২ কেজির সিলিন্ডার ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে।
শনিবার আমদানিকারকদের সঙ্গে বৈঠকে তারাও দাবি করেন, তাদের পক্ষ থেকে সরবরাহ স্বাভাবিক রয়েছে। কোনো কারসাজি হয়ে থাকলে তা পরিবেশক ও খুচরা বিক্রেতাদের পর্যায়ে হতে পারে এবং তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান তারা।
অন্যদিকে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির সাংগঠনিক সম্পাদক আবু তাহের বলেন, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে আমদানিকারকরা সরবরাহ প্রায় ৮০ শতাংশ কমিয়ে দিয়েছেন। ২৫ সেপ্টেম্বরের পর তা পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায় বলেও দাবি করেন তিনি। তার ভাষ্য, ঘোড়াশালে ওমেরা এলপিজির ডিপোতে তার একটি ট্রাক সাত দিন ধরে অপেক্ষায় রয়েছে, কিন্তু গ্যাস দেওয়া হচ্ছে না। একইভাবে আরও শত শত ট্রাক সেখানে অপেক্ষা করছে।
রাষ্ট্রীয় একটি গোয়েন্দা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়ার প্রবণতা দেখে পাঁচটি কোম্পানি ২২ সেপ্টেম্বর থেকে বিক্রি প্রায় বন্ধ করে দেয়। নতুন দামে বিক্রির জন্য তারা হাজার হাজার টন এলপিজি মজুত করে রাখে বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, আগস্টে দেশে ১ লাখ ৫৮ হাজার টন এবং সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি হয়েছে। ফলে সামগ্রিক আমদানির পরিমাণ বিবেচনায় বাজারে সরবরাহ ঘাটতির সুযোগ থাকার কথা নয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
এদিকে সেপ্টেম্বর মাসে বিইআরসি নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি বিক্রি করা হচ্ছে—এমন লিখিত অভিযোগও দিয়েছে এলপি গ্যাস ব্যবসায়ী সমবায় সমিতি। ২১ সেপ্টেম্বর বিইআরসি চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া অভিযোগে সংগঠনটি জানায়, ১২ কেজির সিলিন্ডারের জন্য পরিবেশকদের কাছ থেকে নির্ধারিত ১ হাজার ৪৭৫ টাকার বদলে ১ হাজার ৫৫০ থেকে ১ হাজার ৭২০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হচ্ছে। ফলে বিইআরসি নির্ধারিত ১ হাজার ৫৮৫ টাকা দরে ভোক্তাদের কাছে বিক্রি করা সম্ভব হচ্ছে না।
পরিস্থিতি বিবেচনায় জরুরি পদক্ষেপ নেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ওই চিঠিতে স্বাক্ষর করেন সংগঠনটির সভাপতি মো. সেলিম খান।
পরিবেশক, খুচরা বিক্রেতা ও গোয়েন্দা প্রতিবেদনে অবৈধ মজুতের অভিযোগ উঠে এলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কার্যকর ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। জেলা প্রশাসকদের মাধ্যমে মোবাইল কোর্ট পরিচালনার ঘোষণা দেওয়া হলেও বাজারে এর বড় কোনো প্রভাব দেখা যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
এদিকে আন্তর্জাতিক বাজারদরের সঙ্গে সমন্বয় করে রোববার (৪ অক্টোবর) নতুন এলপিজির দাম ঘোষণা করার কথা রয়েছে বিইআরসির। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নতুন দর ঘোষণার আগে পর্যন্ত আমদানিকারকরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন।
এনবিআরের তথ্য অনুযায়ী, সেপ্টেম্বরে সবচেয়ে বেশি এলপিজি আমদানি করেছে ইউনাইটেড গ্রুপ—৩৫ হাজার টন। এরপর রয়েছে যমুনা এলপিজি ৩০ হাজার টন, বিএম এলপিজি ২১ হাজার ৮০০ টন, ওমেরা ১৮ হাজার টন, পেট্রোম্যাক্স ১৩ হাজার টন এবং ফ্রেশ এলপিজি ১৩ হাজার ৫০০ টন। সব মিলিয়ে ১২টি কোম্পানি সেপ্টেম্বরে ১ লাখ ৫৬ হাজার টন এলপিজি আমদানি করেছে।
২০২১ সালে আমদানিকারকদের সুপারিশের ভিত্তিতে আগের মাসের দামে পরের মাসে এলপিজি বিক্রির ‘মাইনাস ওয়ান’ পদ্ধতি চালু করা হয়েছিল। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়লে আমদানিকারকদের সংগঠন লোয়াবের পক্ষ থেকে নিজেদের মতো করে দাম বাড়িয়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে। এতে বাজারে বিশৃঙ্খলা তৈরি হলে বিইআরসি পরবর্তী সময়ে প্রতি মাসের ১ তারিখে সৌদি সিপি মূল্য পাওয়ার পর নতুন দাম সমন্বয় করে আসছে।
সেই হিসাবে অক্টোবরের জন্য নতুন সৌদি সিপি মূল্য পাওয়ার পর রোববার (৪ অক্টোবর) এলপিজির নতুন দাম ঘোষণা করার কথা রয়েছে।