নিজস্ব প্রতিবেদক
স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম-কে ঘিরে সৃষ্ট বিতর্কে বিএনপির একাধিক সংসদ সদস্য, মন্ত্রী ও দলের জ্যেষ্ঠ নেতারা অস্বস্তি ও বিব্রতবোধ করছেন। তাদের মতে, বিষয়টি সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করার পাশাপাশি বিরোধীদের সমালোচনার সুযোগ করে দিয়েছে।
দলীয় ও সরকারি সূত্রে জানা গেছে, প্রতিমন্ত্রীর নির্বাচনী এলাকায় নবগঠিত তিনটি ইউনিয়নের মধ্যে দুটি তার দুই ছেলের নামের সঙ্গে মিলে যাওয়ার অভিযোগ সামনে আসার পর থেকেই বিতর্কের সূত্রপাত। বিষয়টি সংসদে আলোচনায় উঠলে প্রতিমন্ত্রী দাবি করেন, নামের এই মিল ‘মিরাকল’ বা অলৌকিক ঘটনা।
তবে তার এই ব্যাখ্যায় সন্তুষ্ট নন দলের অনেক নেতা ও জনপ্রতিনিধি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে কয়েকজন মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য জানিয়েছেন, বর্তমান সরকারের প্রায় চার মাসের মেয়াদে এই প্রথম কোনো মন্ত্রী বা প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ড নিয়ে তারা প্রকাশ্যে না হলেও ভেতরে ভেতরে এতটা অস্বস্তিতে পড়েছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগের একজন মন্ত্রী বলেন, “প্রধানমন্ত্রী যেখানে নিজের পরিবারের সদস্যদের নামেও কোনো প্রতিষ্ঠান বা স্থাপনার নামকরণ করতে অনাগ্রহী, সেখানে একজন প্রতিমন্ত্রীর আরও সতর্ক থাকা উচিত ছিল। সংসদে বিষয়টি ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্রেও তার আরও দায়িত্বশীল হওয়া প্রয়োজন ছিল।”
উত্তরাঞ্চলের আরেকজন মন্ত্রী বলেন, “নিজের এলাকার উন্নয়ন সবাই চায়। কিন্তু ইউনিয়নের নাম নিয়ে বিতর্ক সৃষ্টি হলে সাধারণ মানুষের কোনো উপকার হয় না। বরং সরকারের অর্জনগুলো আড়ালে পড়ে যায়।”
ঢাকা বিভাগের এক মন্ত্রী বলেন, “ধরে নিলাম নামের মিল কাকতালীয়। তারপরও প্রশ্ন থাকে, বিষয়টি চূড়ান্ত হওয়ার আগে তিনি কেন তা থামানোর উদ্যোগ নিলেন না? এতে বিরোধীদের অপ্রয়োজনীয় সুযোগ দেওয়া হয়েছে।”
সংসদ সদস্যদের মধ্যেও এ নিয়ে অসন্তোষ রয়েছে। একাধিক এমপি অভিযোগ করেছেন, প্রতিমন্ত্রীর কর্মকাণ্ডের কারণে তাদেরও বিভিন্ন প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
একজন সংসদ সদস্য বলেন, “তার ব্যাখ্যা অত্যন্ত দুর্বল। এতে শুধু বিরোধীরাই নয়, দলের ভেতরেও অস্বস্তি তৈরি হয়েছে। অনেকের মনে হচ্ছে তিনি বিষয়টিকে যথেষ্ট গুরুত্ব দিচ্ছেন না।”
দলীয় সূত্রে জানা গেছে, বিষয়টি বিএনপির নীতিনির্ধারণী পর্যায়েও আলোচনায় এসেছে। স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য মনে করছেন, দীর্ঘ রাজনৈতিক সংগ্রামের পর ক্ষমতায় এসে দলের ভাবমূর্তি ক্ষতিগ্রস্ত হয়—এমন কোনো কর্মকাণ্ড গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য বলেন, “দীর্ঘ ১৭ বছরের আন্দোলন-সংগ্রামের পর আমরা জনগণের ভোটে ক্ষমতায় এসেছি। এখন কোনো ব্যক্তি যদি নিজের কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সরকার ও দলের ভাবমূর্তি প্রশ্নবিদ্ধ করেন, সেটি অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়।”
অন্যদিকে, প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের নির্বাচনী এলাকায় অতিরিক্ত উন্নয়ন বরাদ্দ এবং তার পরিবারের সদস্যদের সম্পৃক্ততা নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনের বিষয়েও দলের ভেতরে আলোচনা চলছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী শাহে আলমের কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি। গতকাল রাতে তার সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, বিতর্কটি এখন শুধু একটি ইউনিয়নের নামকরণ ইস্যুতে সীমাবদ্ধ নেই; বরং এটি সরকারের জবাবদিহিতা ও রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে সম্পর্কিত একটি আলোচনায় পরিণত হয়েছে। এখন বিষয়টি নিয়ে সরকার বা দলীয় উচ্চপর্যায় কী সিদ্ধান্ত নেয়, সেদিকেই নজর রাজনৈতিক মহলের।