আন্তর্জাতিক ডেস্ক
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হতে আর মাত্র তিন মাস বাকি। এরই মধ্যে মহাসচিব পদে নির্বাচনের চতুর্থ দফার অনানুষ্ঠানিক ভোটেও শীর্ষস্থান ধরে রেখেছেন কোস্টারিকার রেবেকা গ্রিনস্প্যান। তাঁর পরেই রয়েছেন গায়ানার ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বার্কেট। আর সামান্য ব্যবধানে পিছিয়ে আছেন আর্জেন্টিনার রাফায়েল গ্রোসি।
মঙ্গলবার জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে চতুর্থ দফার অনানুষ্ঠানিক ভোট অনুষ্ঠিত হয়। এতে পরিষদের ১৫ সদস্য প্রতিটি প্রার্থীকে ‘সমর্থন’, ‘অসমর্থন’ অথবা ‘কোনো মতামত নেই’—এই তিনটি শ্রেণিতে মূল্যায়ন করেন।
এবারও প্রথম হয়েছেন জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার বর্তমান প্রধান রেবেকা গ্রিনস্প্যান। তিনি পেয়েছেন ১০টি সমর্থনসূচক ভোট, তিনটি অসমর্থনসূচক ভোট এবং দুটি ‘কোনো মতামত নেই’ ভোট।
দ্বিতীয় স্থানে থাকা গায়ানার রাষ্ট্রদূত ক্যারোলিন রদ্রিগেস-বার্কেট পেয়েছেন যথাক্রমে আটটি, ছয়টি ও একটি ভোট। আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (আইএইএ) মহাপরিচালক রাফায়েল গ্রোসি পেয়েছেন আটটি সমর্থনসূচক ভোট। তবে তাঁর বিপক্ষে ভোট পড়েছে সাতটি।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের নিউইয়র্কে জাতিসংঘবিষয়ক পরিচালক ড্যানিয়েল ফোর্তি বলেন, “রেবেকা গ্রিনস্প্যান নিজেকে একজন শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। জাতিসংঘের ৮১তম সাধারণ পরিষদের উচ্চপর্যায়ের অধিবেশন চলাকালে নিউইয়র্কের কূটনীতিকদের মধ্যে তাঁর জনপ্রিয়তা বেড়েছে।”
তবে মহাসচিব নির্বাচনের প্রতিযোগিতা এখনো শেষ হয়ে যায়নি। নিরাপত্তা পরিষদ এখনো এমন পর্যায়ে পৌঁছায়নি, যেখানে বিভিন্ন রঙের ব্যালট ব্যবহার করে পাঁচ স্থায়ী সদস্যের ভোট অন্য সদস্যদের ভোট থেকে আলাদা করা হয়। যুক্তরাষ্ট্র, চীন, রাশিয়া, যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স—এই পাঁচ দেশের প্রত্যেকেরই ভেটো দেওয়ার ক্ষমতা রয়েছে।
গত সপ্তাহে চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট মিশেল ব্যাচেলেট প্রার্থিতা প্রত্যাহার করায় এখন সাতজন প্রার্থী প্রতিযোগিতায় রয়েছেন। ভেটো ক্ষমতাধর দেশগুলোর কেউ এখনো প্রকাশ্যে কোনো প্রার্থীকে আটকে দেয়নি। ফলে বাকি প্রার্থীদের প্রতিযোগিতায় থাকার সুযোগ রয়েছে।
চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ
নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কেউই এখন পর্যন্ত প্রকাশ্যে নিজেদের পছন্দের প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেনি। তবে চীনের অবস্থান সম্পর্কে ধারণা দেওয়ার দাবি করেছে সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট।
চীনা সংবাদমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বেইজিং গ্রিনস্প্যান ও রদ্রিগেস-বার্কেটকে বিবেচনায় রাখছে। তবে ওয়াশিংটনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠতার অভিযোগে রাফায়েল গ্রোসিকে বাদ দেওয়ার কথা ভাবছে চীন।
বেইজিং লাতিন আমেরিকার দুই প্রার্থীর একজনকে সমর্থন করতে পারে বলে ধারণা করা হলেও অন্য স্থায়ী সদস্যদের অবস্থানও নির্বাচনের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ট্রাম্প প্রশাসন গ্রিনস্প্যানকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে বিবেচনা করতে পারে। তিনি জাতিসংঘের বাণিজ্য ও উন্নয়নবিষয়ক সংস্থার নেতৃত্ব দিচ্ছেন, যে সংস্থাকে কখনো কখনো বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার তুলনায় বেশি বামঘেঁষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
মহাসচিব নির্বাচিত হতে হলে কোনো প্রার্থীকে নিরাপত্তা পরিষদের ১৫ সদস্যের মধ্যে অন্তত নয়টি ভোট পেতে হবে। পাশাপাশি পাঁচ স্থায়ী সদস্যের কারও ভেটো এড়াতে হবে।
ওয়াশিংটনভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য হিল-এ প্রকাশিত এক মতামত নিবন্ধে রক্ষণশীল ও ইসরায়েলপন্থী থিংকট্যাংক ফাউন্ডেশন ফর দ্য ডিফেন্স অব ডেমোক্রেসিজের উপদেষ্টা রিচার্ড গোল্ডবার্গ ও গবেষক বেন কোহেন নির্বাচনে এখনো বড় ধরনের চ্যালেঞ্জ থাকার কথা উল্লেখ করেছেন।
তাঁদের দাবি, গায়ানার প্রার্থী রদ্রিগেস-বার্কেট চীনের সঙ্গে অতিরিক্ত ঘনিষ্ঠ, কিউবার প্রয়াত নেতা ফিদেল কাস্ত্রোকে সমর্থন করেছেন এবং হামাসের প্রতি সহানুভূতিশীল। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনি গাজায় ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডকে ‘গণহত্যা’ বলে অভিহিত করেছিলেন।
এই মন্তব্যগুলো থেকে হোয়াইট হাউসের নীতিনির্ধারকেরা প্রার্থীদের কীভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন, সে সম্পর্কে কিছুটা ধারণা পাওয়া যায়।
নারী মহাসচিব নিয়োগের দাবি জোরালো
জাতিসংঘ ও নাগরিক সমাজের বিভিন্ন মহলে এবার একজন নারীকে মহাসচিব নিয়োগের দাবি ক্রমেই জোরালো হচ্ছে। সংস্থাটির আগের নয়জন মহাসচিবই ছিলেন পুরুষ। তবে এবার শীর্ষ প্রতিদ্বন্দ্বীদের মধ্যে রয়েছেন দুই নারী।
ড্যানিয়েল ফোর্তি বলেন, “সুযোগ পেতে হলে প্রার্থীদের নিজেদের সক্ষমতা প্রমাণ করতে হবে এবং সম্পর্ক গড়ে তুলতে হবে। একই সঙ্গে পাঁচ স্থায়ী সদস্যকে (পি৫) যতটা সম্ভব অসন্তুষ্ট করা এড়িয়ে চলতে হবে।”
তাঁর মতে, জাতিসংঘের ভেতরে পর্দার আড়ালে এখনো অনেক কিছু ঘটতে পারে।
চমকপ্রদ কোনো প্রার্থী আসছেন?
গ্রিনস্প্যান এগিয়ে থাকলেও প্রার্থীদের মধ্যে ঐকমত্যের অভাব নতুন কাউকে প্রতিযোগিতায় আসার সুযোগ তৈরি করতে পারে। অতীতে বান কি মুন ও আন্তোনিও গুতেরেস—দুজনই চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত হওয়ার আগে প্রতিদ্বন্দ্বীদের তুলনায় উল্লেখযোগ্য ব্যবধানে এগিয়ে ছিলেন।
সম্ভাব্য নতুন প্রার্থী হিসেবে যাঁদের নাম আলোচনায় রয়েছে, তাঁদের মধ্যে আছেন বুলগেরিয়ার সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী নিকোলাই ম্লাদেনভ, জাতিসংঘের উপমহাসচিব আমিনা মোহাম্মদ এবং মেক্সিকোর সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী আলিসিয়া বার্সেনা।
এ ছাড়া সংযুক্ত আরব আমিরাতের মন্ত্রী লানা নুসেইবেহ এবং নেদারল্যান্ডসের সাবেক জাতিসংঘ আন্ডার-সেক্রেটারি-জেনারেল সিগরিড কাগের নামও সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে আলোচনায় রয়েছে।
তবে জাতিসংঘে প্রচলিত অলিখিত ভৌগোলিক পালাক্রমের নিয়ম অনুযায়ী, এবার লাতিন আমেরিকা থেকে মহাসচিব নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। ৩৫ বছর আগে পেরুর হাভিয়ের পেরেজ দে কুয়েয়ার জাতিসংঘের মহাসচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
গুতেরেসের মেয়াদ শেষ হওয়ার সময় যত ঘনিয়ে আসছে, ততই স্পষ্ট হচ্ছে যে শীর্ষে থাকা প্রার্থীকে শেষ পর্যন্ত নির্বাচিত হতে হলে শুধু সংখ্যাগরিষ্ঠ সমর্থন অর্জন করলেই চলবে না; নিরাপত্তা পরিষদের পাঁচ স্থায়ী সদস্যের আপত্তি এড়িয়ে কূটনৈতিক সমঝোতায় পৌঁছানোও হবে বড় চ্যালেঞ্জ।
জেনেভা সলিউশনস