নিজস্ব প্রতিবেদক
টানা আট দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে কক্সবাজারে ভয়াবহ বন্যায় জেলার প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। এতে অন্তত আড়াই লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন। বন্যা ও পাহাড়ধসজনিত বিভিন্ন ঘটনায় ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ মোট ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন।
জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক ক্ষয়ক্ষতির প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। রোববার (১২ জুলাই) রাত থেকে বৃষ্টি কমে আসায় প্লাবিত এলাকার পানি নামতে শুরু করেছে। তবে ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় দুর্ভোগ এখনো অব্যাহত রয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, গত ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত টানা নয় দিনে জেলায় মোট ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। সোমবার সন্ধ্যা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত হয়েছে মাত্র ৪ মিলিমিটার।
সবচেয়ে বেশি ক্ষতি পেকুয়ায়
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি এবং পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটি প্লাবিত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে পেকুয়া উপজেলা, যেখানে ৯৫ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। এছাড়া মাতামুহুরীর ৮৫ শতাংশ, চকরিয়ার ৮০ শতাংশ, কুতুবদিয়ার ৬৫ শতাংশ এবং মহেশখালীর ৫০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
প্রাণহানি ও বসতবাড়ির ক্ষতি
বন্যা ও পাহাড়ধসে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি ঘটেছে উখিয়ায়। সেখানে ১৩ জন রোহিঙ্গাসহ ১৪ জন মারা গেছেন। এছাড়া চকরিয়ায় ছয়জন, কক্সবাজার সদরে তিনজন, রামুতে তিনজন, পেকুয়ায় দুজন এবং মাতামুহুরী, মহেশখালী ও কুতুবদিয়ায় একজন করে নিহত হয়েছেন। একজন এখনও নিখোঁজ রয়েছেন।
প্রাথমিক হিসাবে জেলার এক হাজার ৬১৩টি বসতবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে পেকুয়ায় ৪৫০টি, চকরিয়ায় ৩০০টি, কুতুবদিয়ায় ২৫০টি এবং মহেশখালীতে ২০০টি ঘরবাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
মৎস্য ও কৃষিতে ব্যাপক ক্ষতি
জেলা মৎস্য বিভাগের হিসাবে, বন্যায় প্রায় ৪৬ কোটি ২২ লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ৩ হাজার ৯১৮টি পুকুর ও ৪৫৩টি চিংড়িঘের। নষ্ট হয়েছে এক হাজার ৯৭ টন মাছ, ৩৮৫ টন চিংড়ি এবং বিপুল পরিমাণ মাছ ও চিংড়ির পোনা।
অন্যদিকে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যে জানা গেছে, আউশ ধান, আমনের বীজতলা, পানবরজ ও বিভিন্ন সবজিসহ ৪ হাজার ২১১ হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে জেলার ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বাঁধ, সড়ক ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ক্ষয়ক্ষতি
পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, টানা বৃষ্টিতে জেলার ৪৪টি স্থানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। চকরিয়ার কোনাখালী এলাকায় প্রায় ২৫ মিটার বাঁধ ও একটি সেতুর অংশ ভেঙে গেছে।
এছাড়া প্রাথমিক হিসাবে ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক, ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট এবং ৩০টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায়।
ত্রাণ কার্যক্রম চলমান
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, বন্যার সময় ৬১৮টি আশ্রয়কেন্দ্রে ১ হাজার ৫৮০ জন আশ্রয় নেন। দুর্গত মানুষের মধ্যে ৭ হাজার ৭৯০ প্যাকেট শুকনো খাবার ও ২৯৮ টন চাল বিতরণ করা হয়েছে। অতিরিক্ত ত্রাণের জন্য মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে।
তবে দুর্গতদের অভিযোগ, প্রয়োজনের তুলনায় ত্রাণ অপ্রতুল। বিশেষ করে বিশুদ্ধ পানি, খাদ্য ও শিশুদের জন্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রীর প্রতিনিধি হিসেবে কক্সবাজার সফররত বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য অমিত বলেছেন, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত কোনো মানুষকে সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত রাখা হবে না। দুর্গম এলাকাগুলোতেও সেনাবাহিনী, বিজিবি, পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে।