নিজস্ব প্রতিবেদক
টেকসই পর্যটন ব্যবস্থাপনায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ব্যবহার, আধুনিক প্রযুক্তির প্রয়োগ এবং পরিবেশবান্ধব পর্যটন গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিয়ে শেষ হয়েছে বাংলাদেশ ট্রাভেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ফেয়ার (বিটিটিএফ) ২০২৬। তিন দিনব্যাপী এ মেলায় প্রায় ৪৩ কোটি টাকার ব্যবসা ও বাণিজ্যিক লেনদেন হয়েছে। মেলা পরিদর্শন করেছেন ৪৫ হাজারের বেশি দর্শনার্থী।
মেলায় বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স ও ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্সের টিকিট বিক্রিতে ব্যাপক সাড়া পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছে আয়োজকরা।
শনিবার (৩১ অক্টোবর) রাজধানীর ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্টে আয়োজিত সমাপনী অনুষ্ঠানের মধ্য দিয়ে শেষ হয় ১৪তম এ পর্যটন মেলা। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (টোয়াব) আয়োজিত মেলার সমাপনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত।
অনুষ্ঠানে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের সচিব ড. নূরুন্নাহার চৌধুরী, জাতীয় দক্ষতা উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. নাজনীন কাউসার চৌধুরী, বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. সামীমুজ্জামান, বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ব্যারিস্টার মুতাসিম বিল্লাহ ফারুকী, বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও কাইজার সোহেল আহমেদ, বাংলাদেশ ট্যুরিস্ট পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি জিএম আজিজুর রহমান, টোয়াবের সভাপতি ও নেতৃবৃন্দসহ দেশি-বিদেশি পর্যটন খাতের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন।
প্রধান অতিথির বক্তব্যে পর্যটনমন্ত্রী এম. রশিদুজ্জামান মিল্লাত বলেন, বাংলাদেশের পর্যটন খাতের সম্ভাবনা অনেক বেশি। এ সম্ভাবনা কাজে লাগাতে যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়নের পাশাপাশি এভিয়েশন খাত সম্প্রসারণ করা হয়েছে। পর্যটন খাতকে সমৃদ্ধ করতে সরকার একটি মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। এর আওতায় হোটেল ও রিসোর্টগুলোকে নিয়মনীতি, প্রযুক্তি ও টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে পরিচালনার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, রিসোর্টগুলোতে বিদ্যুতের ঘাটতি পূরণে সৌর প্যানেল স্থাপন এবং ন্যাশনাল হোটেল অ্যান্ড ট্যুরিজম ট্রেনিং ইনস্টিটিউটের (এনএইচটিটিআই) মাধ্যমে তরুণদের প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রের ব্যবস্থাপনা, পর্যটকদের নিরাপত্তা, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও জরুরি সেবা নিশ্চিত করতে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। বিশেষ করে ডিজিটাল তথ্যসেবা ও স্মার্ট মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর মাধ্যমে পর্যটন গন্তব্যগুলোকে আরও দায়িত্বশীল ও টেকসই করা সম্ভব।
পর্যটনে এআই ব্যবহারে সেমিনার
সমাপনী অনুষ্ঠানের আগে মেলার মূল ভেন্যু বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে (বিসিএফসিসি) ‘এআই ফর সাসটেইনেবল ট্যুরিজম অপারেশন’ শীর্ষক একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়। এতে পর্যটন খাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার এবং টেকসই উন্নয়নের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করেন বিশেষজ্ঞরা।
বক্তারা বলেন, পর্যটকদের অনুসন্ধান ও বুকিং ব্যবস্থাপনা, মূল্য নির্ধারণ, ভ্রমণসূচি তৈরি, আতিথেয়তা সেবার মান উন্নয়ন এবং ভাষাগত প্রতিবন্ধকতা দূর করতে এআই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। পাশাপাশি পর্যটনকেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড় নিয়ন্ত্রণ, স্থানীয় ব্যবসার প্রসার, বিমান চলাচলে জ্বালানি সাশ্রয়, তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং পরিবেশের ওপর পর্যটনের নেতিবাচক প্রভাব কমাতেও প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানো প্রয়োজন।
তারা আরও বলেন, পর্যটন খাতে এআইয়ের কার্যকর প্রয়োগের জন্য পর্যাপ্ত ও নির্ভরযোগ্য তথ্য, দক্ষ জনবল, উন্নত অবকাঠামো এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব প্রয়োজন। তবে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে গিয়ে পর্যটনের মানবিক দিক, আন্তরিকতা, আতিথেয়তা ও সাংস্কৃতিক অভিজ্ঞতা যেন ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকেও গুরুত্ব দিতে হবে।
সেমিনারে সভাপতিত্ব করেন টোয়াবের ফার্স্ট ভাইস প্রেসিডেন্ট সৈয়দ শাফত উদ্দিন আহমেদ। মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন স্বদেশী কমিউনিকেশনসের সিইও সৈয়দ সাজ্জাদ হোসেন মাহমুদ। আলোচনায় অংশ নেন জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের সহযোগী অধ্যাপক ড. মো. আনোয়ার হোসেন ভূঁইয়া এবং ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির ট্যুরিজম অ্যান্ড হসপিটালিটি ম্যানেজমেন্ট বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক মাহবুব পারভেজ। সেমিনার সঞ্চালনা করেন ধ্রুবতারা ইয়ুথ ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশনের চেয়ারম্যান আখতারুজ্জামান কবির।
আলোচকরা বলেন, পর্যটন কেবল একটি শিল্প নয়; এটি অর্থনীতি, পরিবেশ ও সমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একটি সমন্বিত খাত। এআইয়ের মাধ্যমে পর্যটকদের অনুসন্ধান, বুকিং, মূল্য নির্ধারণ, ভ্রমণ পরিকল্পনা ও আতিথেয়তা ব্যবস্থাপনা আরও কার্যকর করা সম্ভব। পর্যটনসংশ্লিষ্ট তথ্য বিশ্লেষণ করে ভ্রমণ পরিকল্পনার মান উন্নয়ন, পর্যটকদের আস্থা বৃদ্ধি এবং পরিচালন ব্যয় ও পরিবেশগত প্রভাব কমানো যেতে পারে।
তাদের মতে, আবহাওয়া, সাপ্তাহিক ছুটি, বুকিংয়ের পরিমাণ ও যোগাযোগব্যবস্থার তথ্য বিশ্লেষণ করে পর্যটন গন্তব্যগুলোর ব্যবস্থাপনাও উন্নত করা সম্ভব। একইভাবে বিমান চলাচলে এআইভিত্তিক রুট পরিকল্পনার মাধ্যমে জ্বালানি খরচ কমানো যেতে পারে।
পর্যটন খাতের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা, কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও দক্ষতা উন্নয়নেও এআই ভূমিকা রাখতে পারে বলে সেমিনারে উল্লেখ করা হয়। তবে এ খাতের টেকসই বিকাশে দক্ষ জনবল, উন্নত অবকাঠামো, কার্যকর নীতিমালা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের ওপর গুরুত্ব দেন বক্তারা।
২০ দেশের পর্যটন প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ
এবারের ১৪তম বিটিটিএফে নেপাল, ভারত, সিঙ্গাপুর, মালদ্বীপ, ফিলিপাইন, তুরস্ক, সংযুক্ত আরব আমিরাত, চীন, শ্রীলঙ্কা, পাকিস্তান, থাইল্যান্ড, ব্রুনাই, সৌদি আরব, মালয়েশিয়া ও আজারবাইজানসহ ২০টি দেশের জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যটন প্রতিনিধি এবং বিভিন্ন সংস্থা অংশ নেয়। এবারের মেলায় পার্টনার কান্ট্রি ছিল মালয়েশিয়া, পাকিস্তান, ফিলিপাইন ও নেপাল। টাইটেল স্পন্সর হিসেবে ছিল ইউএস-বাংলা এয়ারলাইন্স।
এ ছাড়া এয়ারলাইনস পার্টনার ছিল বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্স, প্লাটিনাম হসপিটালিটি পার্টনার ক্রাউন প্লাজা ঢাকা এয়ারপোর্ট, জিডিএস পার্টনার সেবার, পিআর পার্টনার ওপাস কমিউনিকেশনস লিমিটেড, টেকনোলজি পার্টনার এম৩৬০আইসিটি, ট্রান্সপোর্ট পার্টনার কনভয় সার্ভিস, ডিজিটাল পার্টনার মায়েস্ট্রো এবং অডিও-ভিজ্যুয়াল পার্টনার প্যানোরামা পিসি ক্রিয়েটরস ও রুচি। ভেন্যু পার্টনার ছিল বিসিএফসিসি।
‘এআই পাওয়ার্ড ট্যুরিজম, সাসটেইনেবল ডেস্টিনেশন’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত এ মেলা বাংলাদেশের পর্যটন সম্ভাবনাকে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে তুলে ধরার পাশাপাশি দেশি-বিদেশি অংশীজনদের মধ্যে ব্যবসায়িক যোগাযোগ, অভিজ্ঞতা বিনিময় ও নতুন বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করেছে। একই সঙ্গে পর্যটন খাতের উন্নয়নে প্রযুক্তির ব্যবহার, দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি, সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্ব এবং পরিবেশ সংরক্ষণের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্বারোপ করেছে।