নিজস্ব প্রতিবেদক
বিশ্ববিদ্যালয়ে একাডেমিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি মুক্তবুদ্ধির চর্চা এবং মতপ্রকাশের আহ্বান জানিয়েছেন বাংলাদেশ বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের (ইউজিসি) চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. মামুন আহমেদ। তবে স্বাধীন চিন্তা ও মতপ্রকাশের ক্ষেত্রেও দায়িত্বশীলতার প্রয়োজন রয়েছে বলে মন্তব্য করেছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) ইস্ট ওয়েস্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের নবীন বরণ ২০২৬ ও নজরুল বর্ষ উপলক্ষে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে স্বাধীনভাবে কথা বলা, জ্ঞানচর্চা ও মতামত প্রকাশের সুযোগ থাকতে হবে। তবে স্বাধীনতারও সীমা রয়েছে। তাই মুক্তচিন্তার পাশাপাশি দায়িত্ববোধ গড়ে তোলা জরুরি। শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এমন একাডেমিক পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যেখানে মুক্তবুদ্ধির চর্চা হবে দায়িত্বশীলতার সঙ্গে।
নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশে তিনি বলেন, শুধু মেধা দিয়ে সফলতা অর্জন সম্ভব নয়; এর সঙ্গে প্রয়োজন কঠোর পরিশ্রম, অধ্যবসায় ও অঙ্গীকার। পড়াশোনার পাশাপাশি সহশিক্ষামূলক কর্মকাণ্ডেও যুক্ত হতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শুধু একাডেমিক জ্ঞান অর্জন করে বের হলে চলবে না, কর্মক্ষেত্র ও বাস্তব জীবনের প্রয়োজনীয় দক্ষতা অর্জনের পাশাপাশি সামাজিক, মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিকভাবেও নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে।
দেশের উচ্চশিক্ষার বিভিন্ন চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, উচ্চশিক্ষার ব্যাপক সম্প্রসারণ ঘটলেও মানসম্পন্ন গ্র্যাজুয়েট তৈরিতে এখনো নানা চ্যালেঞ্জ রয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা চাকরির বাজার ও বাস্তব জীবনের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তাই শিক্ষাকে জীবন ও কর্মক্ষেতরের বাস্তবতার সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত করতে হবে।
তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ মানবসম্পদ। শিক্ষার্থীদের মানসম্মত শিক্ষা ও দক্ষতা অর্জনে বিনিয়োগ করা হলে দেশে-বিদেশে তাদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়বে। চাকরির সুযোগ সীমিত থাকলেও অর্জিত দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে নিজেরাই কর্মসংস্থানের পথ তৈরি করতে পারবেন।
উচ্চশিক্ষার মানোন্নয়নে ইউজিসির ভূমিকা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ইউজিসি শুধু বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায় না, বরং সহযোগিতা ও সহায়তা করতে চায়। সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ইউজিসি কোনো বৈষম্য করে না। যে প্রতিষ্ঠান ভালো করছে এবং উন্নতির চেষ্টা করছে, তাদের এগিয়ে নিতে সহযোগিতা করা হবে।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোর্ড অব ট্রাস্টিজ (বিওটি) ও একাডেমিক প্রশাসনের দায়িত্ব প্রসঙ্গে ইউজিসি চেয়ারম্যান বলেন, আইনে তাদের দায়িত্ব ও এখতিয়ার নির্ধারিত রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সবাইকে নিজ নিজ দায়িত্ব ও এখতিয়ারের মধ্যে থেকে কাজ করতে হবে। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো অলাভজনক প্রতিষ্ঠান হিসেবে শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণা ও শিক্ষার্থীদের কল্যাণে অর্থ ব্যয় করবে—এটাই প্রত্যাশা। একই সঙ্গে আর্থিকভাবে অসচ্ছল শিক্ষার্থীদের জন্য বৃত্তির সুযোগ বাড়ানোর ওপরও গুরুত্ব দেন তিনি।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভ্যাট কমানোর বিষয়ে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, ইউজিসির সুপারিশের পর সরকার ভ্যাট ৫ শতাংশ কমিয়েছে। আগামী বছর আরও ৫ শতাংশ কমানোর জন্য ইউজিসি কাজ করছে। ভ্যাট কমার ফলে যে আর্থিক সুবিধা তৈরি হবে, তা শিক্ষক উন্নয়ন, গবেষণা এবং শিক্ষার্থীদের কল্যাণে ব্যয় করার প্রত্যাশা করছে ইউজিসি।
গবেষণায় সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান সুযোগ নিশ্চিত করার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, গবেষণা প্রস্তাব মূল্যায়নের সময় প্রতিষ্ঠানটি সরকারি না বেসরকারি, পুরোনো না নতুন—তা বিবেচনায় নেওয়া হবে না। গবেষণা প্রস্তাবের মেধা ও গুণগত মানই হবে প্রধান বিবেচ্য। দেশের বাস্তব সমস্যা ও সামাজিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় উদ্ভাবনী গবেষণায় ইউজিসি সহযোগিতা করবে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে মানবসম্পদ ও জ্ঞান ভাগাভাগিতে ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলেও জানান ইউজিসি চেয়ারম্যান। শহর ও গ্রামের বিশ্ববিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষগুলোকে ডিজিটালভাবে যুক্ত করে উচ্চশিক্ষার বৈষম্য কমানোর পরিকল্পনা রয়েছে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত বাংলাদেশি শিক্ষক ও গবেষকদের দেশের বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে যুক্ত করা এবং পিএইচডি ফেলোশিপের সংখ্যা বাড়ানোর পরিকল্পনাও রয়েছে বলে জানান তিনি।
নজরুলের সাহিত্য ও দর্শনের প্রসঙ্গ তুলে অধ্যাপক মামুন আহমেদ বলেন, বৈষম্যের বিরুদ্ধে এবং অসাম্প্রদায়িক সমাজ ও রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠায় কাজী নজরুল ইসলামের চিন্তা এখনো অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। প্রতিকূলতা মোকাবিলায়ও তাঁর দর্শন মানুষকে অনুপ্রেরণা জোগায়।
অনুষ্ঠানে ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির বোর্ড অব ট্রাস্টিজের চেয়ারপার্সন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ফরাসউদ্দিন, উপাচার্য অধ্যাপক ড. শামস রহমান, ডিন অধ্যাপক ড. অনুপ চৌধুরীসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, বিওটি সদস্য ও শিক্ষার্থীরা উপস্থিত ছিলেন।