ইবি প্রতিনিধি
জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬ উপলক্ষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের (ইবি) শিক্ষার্থীদের জন্য উন্নতমানের খাবারের উদ্যোগ নিয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের হল প্রশাসন। তবে একই খাবারের জন্য আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে ভিন্ন ভিন্ন মূল্য নির্ধারণ করায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক সমালোচনা ও নিন্দার ঝড় উঠেছে।
শনিবার (২৫ জুলাই) খালেদা জিয়া হলের প্রভোস্ট এবং হল প্রভোস্ট কাউন্সিলের সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. জালাল উদ্দিন স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আগামী ২৮ জুলাই থেকে ২ আগস্ট পর্যন্ত প্রতিদিন বেলা ৩টা পর্যন্ত নির্ধারিত ফি জমা দিয়ে শিক্ষার্থীরা খাবারের টোকেন সংগ্রহ করতে পারবেন। ৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।
তবে টোকেনের মূল্যে আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে পার্থক্য রাখা হয়েছে। হল প্রভোস্ট কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য টোকেন মূল্য ৭০ টাকা এবং অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য ১০০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে।
এ সিদ্ধান্তের পর একই আয়োজনের খাবারের ক্ষেত্রে মূল্য বৈষম্য নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন শিক্ষার্থীরা। তাদের দাবি, একই বিশ্ববিদ্যালয়, একই অনুষ্ঠান এবং একই খাবারের ক্ষেত্রে আলাদা মূল্য নির্ধারণ বৈষম্যমূলক।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে মো. জুবায়ের হোসেন লিখেছেন, "বুঝি না, হল প্রশাসনের লোকজন গালমন্দ না খেলে কি জমে না? প্রতিবাদ ছাড়া এরকম বৈষম্যমূলক আচরণ কবে যে বন্ধ করবে, আল্লাহই ভালো জানেন।"
ব্যঙ্গ করে তোফায়েল আহমেদ লিখেছেন, "মাসের শেষে এমনিতেই টাকা-পয়সার হিসাব নিয়ে আতঙ্কে আছি। প্লিজ, কেউ স্মারকলিপি দিয়ে আবাসিক-অনাবাসিক টাকার পরিমাণ সমান করান।"
নাকিবুল ইসলাম আকন লিখেছেন, "একই ক্যাম্পাস, একই অনুষ্ঠান, একই খাবার তবুও ভিন্ন টোকেন মূল্য! শিক্ষার্থীদের মধ্যে বিভাজন সৃষ্টি করে এমন এই অযৌক্তিক সিদ্ধান্ত অবিলম্বে বাতিল করে সকলের জন্য সমান টোকেন মূল্য নিশ্চিত করতে হবে।"
এদিকে বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন বিশ্ববিদ্যালয় ক্রিয়াশীল রাজনৈতিক ছাত্রসংগঠনের নেতারা।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো. রিফাত হোসেন লিখেছেন, "বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন কি বিতর্ক ছাড়া কিছু করতে পারে না? নাকি তারা বিতর্ক ছাড়া কিছু করতেই চায় না? বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংগঠন শিক্ষার্থীদের দাবি নিয়ে গেলে কি খুব বিরক্ত হন? ২২ জুলাই ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল যে স্মারকলিপি জমা দিয়েছিল, সেখানে শিক্ষার্থীদের এই দাবিও ছিল। হয়তো আপনারা সেটা পড়েননি, অথবা আমলে নেননি। একই বিশ্ববিদ্যালয়, একই অনুষ্ঠান, একই মানের খাবার—তাহলে বৈষম্য কেন?"
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের আহ্বায়ক এসএম সুইট লিখেছেন, "এ বছর '৫ আগস্ট জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস' উপলক্ষে প্রশাসন আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের টোকেন মূল্য যথাক্রমে ৭০ ও ১০০ টাকা নির্ধারণ করেছে। অথচ গত বছর উভয়ের জন্যই টোকেন মূল্য ছিল মাত্র ৫০ টাকা। এই বৈষম্যের নিন্দা জানাই। একই সঙ্গে আবাসিক ও অনাবাসিক সকলের জন্য টোকেনের মূল্য ৫০ টাকা করার দাবি জানাচ্ছি।"
ছাত্রশিবিরের সেক্রেটারী মোঃ রাশেদুল ইসলাম রাফি লিখেছেন, 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬' উপলক্ষে প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত খাবারের মূল্যের বিষয়টি আমাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। যেখানে আবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য খাবারের মূল্য ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে, সেখানে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ধারণ করা হয়েছে ১০০ টাকা। যে জুলাই বিপ্লব ও গণঅভ্যুত্থানের মূল চেতনাই ছিল 'বৈষম্যহীন সমাজ ও ক্যাম্পাস গঠন', সেখানে এই দিবস উদযাপনেই আবাসিক ও অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন আর্থিক বৈষম্য সকলকে ব্যথিত করে। ক্যাম্পাসের প্রতিটি শিক্ষার্থীই বিশ্ববিদ্যালয়ের সমান অংশীদার। তাই বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে অনুরোধ আবাসিক ও অনাবাসিক বৈষম্য দূর করে, সকল শিক্ষার্থীর কথা বিবেচনা করে খাবারের মূল্য ৭০ টাকা নির্ধারণ করা হোক।
বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক মো. মাসুদ রুমি মিথুন লিখেছেন, "আগামী ৫ আগস্ট 'জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস-২০২৬' উপলক্ষে উন্নতমানের খাবারের টোকেন মূল্য আবাসিক (৭০ টাকা) ও অনাবাসিক (১০০ টাকা) শিক্ষার্থীদের জন্য পৃথক নির্ধারণ করায় ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছে। বৈষম্যহীন বাংলাদেশের স্বপ্নে রক্ত দেওয়া গণঅভ্যুত্থানের স্মারক দিবসে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মধ্যে এমন দ্বিমুখী নীতি অত্যন্ত দুঃখজনক এবং গণঅভ্যুত্থানের চেতনার পরিপন্থী।"
তিনি আরো বলেন, "আমরা অবিলম্বে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য অতিরিক্ত ফি প্রত্যাহার এবং সকল শিক্ষার্থীর জন্য অভিন্ন ও সুলভ মূল্যে খাবারের টোকেন নিশ্চিত করার দাবি জানাচ্ছি। শিক্ষার্থীদের যেকোনো ন্যায্য অধিকার আদায়ে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রদল আপসহীনভাবে পাশে থাকবে।"
এ বিষয়ে হল প্রভোস্ট কাউন্সিলের সভাপতি এবং খালেদা জিয়া হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. জালাল উদ্দীন বলেন, আমাদের হল গুলো আর্থিকভাবে সংকটে আছে। পাশাপাশি প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে সহযোগিতা করা হচ্ছে সেটাও অপ্রতুল। ইতোপূর্বে অনাবাসিক শিক্ষার্থীদের জন্য সেভাবে আয়োজন ই হতো না, জুলাই পরবর্তীতে আমরা সেটিও চালু করেছি। আর আবাসিক শিক্ষার্থীরা হলের পেছনে একটা বড় এমাউন্ট কন্ট্রিবিউট করে যা অনাবাসিকরা করে না। এটা মাথায় রেখেই প্রশাসনের সবাই আলোচনা করে এই ফি নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিষয় টা সবাইকেই ইতিবাচকভাবে নেওয়ার আহবান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, শিক্ষার্থীদের প্রতি আমার আবেদন থাকবে যে এটা খুব বেশি টাকা না। আমরা প্রোগ্রামটা সাকসেসফুলি করতে চাই এবং আমাদের আর্থিক অবস্থা যদি ভালো অবস্থায় থাকত, তাহলে আমরা সবার জন্যই সমানভাবে করতাম। প্রশাসন বা ইউনিভার্সিটি ভালোভাবে চালাতে গেলে সবাইকেই একটু আন্তরিকতার সাথে এগিয়ে আসতে হয়। শিক্ষার্থীদেরও এগিয়ে আসার আহবান জানাই।