ময়মনসিংহ প্রতিনিধি
ময়মনসিংহের ঈশ্বরগঞ্জে ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবল স্রোতে নিখোঁজ হওয়ার তিন দিন পর কৃষক সাইফুল ইসলাম (৫৫)-এর মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। নিখোঁজ হওয়ার স্থান থেকে প্রায় ৩০ কিলোমিটার ভাটিতে গফরগাঁও উপজেলার হোসেনপুর এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদে একটি ড্রেজার মেশিনের পাইপে আটকে থাকা অবস্থায় শুক্রবার সকালে স্বজনরা তাঁর মরদেহের সন্ধান পান।
নিহত সাইফুল ইসলাম ঈশ্বরগঞ্জ উপজেলার উচাখিলা ইউনিয়নের মরিচারচর টানমলামারি গ্রামের মৃত ইদ্রিস আলীর ছেলে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, গত বুধবার (৫ আগস্ট) দুপুর সাড়ে ২টার দিকে উচাখিলা ইউনিয়নের বটতলা বালুঘাট এলাকায় ব্রহ্মপুত্র নদের প্রবল স্রোতে ভেসে যাওয়া একটি নৌকার পাটাতন উদ্ধারের জন্য নদীতে নামেন সাইফুল। পাটাতনটি ধরার চেষ্টা করার সময় তীব্র স্রোতের টানে তিনি পানিতে তলিয়ে যান।
এরপর স্থানীয়রা নৌকা নিয়ে বিভিন্ন স্থানে খোঁজাখুঁজি করেও তাঁর কোনো সন্ধান পাননি। খবর পেয়ে ময়মনসিংহ ফায়ার সার্ভিসের লিডার জলিলের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের একটি ডুবুরি দল ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার অভিযান শুরু করে। প্রায় দুই ঘণ্টা অভিযান চালিয়েও কোনো সন্ধান না পাওয়ায় বুধবার সন্ধ্যায় অভিযান স্থগিত করা হয়।
পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৩টা পর্যন্ত সাত ঘণ্টারও বেশি সময় ব্রহ্মপুত্র নদের বিভিন্ন স্থানে তল্লাশি চালানো হয়। এরপরও সাইফুলের সন্ধান না পাওয়ায় উপজেলা প্রশাসন ও পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে আলোচনা করে সরকারি উদ্ধার অভিযান সমাপ্ত ঘোষণা করে ফায়ার সার্ভিস।
তবে সরকারি অভিযান শেষ হলেও হাল ছাড়েননি স্বজনরা। শুক্রবার সকালে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে স্থানীয় ২০ থেকে ২৫ জন একটি ট্রলার নিয়ে ব্রহ্মপুত্র নদে তল্লাশি শুরু করেন। নিখোঁজ হওয়ার স্থান থেকে নদীর স্রোতের গতিপথ অনুসরণ করে ভাটির দিকে তাঁরা অনুসন্ধান চালাতে থাকেন।
একপর্যায়ে গফরগাঁও উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদে ব্রিজসংলগ্ন হোসেনপুর এলাকায় একটি ড্রেজার মেশিনের পাইপে আটকে থাকা একটি মরদেহ দেখতে পান তাঁরা। পরে কাছে গিয়ে স্বজনরা মরদেহটি সাইফুল ইসলামের বলে শনাক্ত করেন। এরপর মরদেহ উদ্ধার করে ট্রলারে করে নদীপথে তাঁর নিজ বাড়িতে নিয়ে যাওয়া হয়।
সাইফুল ইসলামের মৃত্যুতে পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এসেছে। স্বজনরা জানান, বহু বছর আগে তাঁর বাবা ইদ্রিস আলীও নদীতে ডুবে মারা গিয়েছিলেন। এবার একই নদীতে প্রাণ গেল তাঁর ছেলেরও। এক পরিবারের দুই প্রজন্মকে ব্রহ্মপুত্রের বুকে হারানোর ঘটনায় এলাকায় শোকের আবহ সৃষ্টি হয়েছে।
ঈশ্বরগঞ্জ ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের কর্মকর্তা রাম প্রসাদ পাল বলেন, দুই দিন ধরে ডুবুরি দল সর্বোচ্চ চেষ্টা করেও নিখোঁজ ব্যক্তির সন্ধান পায়নি। ব্রহ্মপুত্রের প্রবল স্রোতের কারণে মরদেহ অনেক দূরে ভেসে যেতে পারে বলে ধারণা করা হয়েছিল। উদ্ধার অভিযান শেষ করার সময় স্বজনদের ট্রলার নিয়ে নদীতে নজরদারি চালিয়ে যেতে এবং ভাটির বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ রাখার পরামর্শ দেওয়া হয়েছিল। শেষ পর্যন্ত প্রায় ৩০ কিলোমিটার দূরে মরদেহটি পাওয়া গেছে।
তিন দিনের উৎকণ্ঠা, অপেক্ষা ও নিরন্তর খোঁজাখুঁজির পর সাইফুল ইসলাম ফিরেছেন নিজের বাড়িতে। তবে জীবিত নয়, নিথর দেহে। পরিবারের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান হলেও প্রিয়জনকে হারানোর বেদনা থেকে গেল আজীবনের জন্য।